কাল ডাক্তার দেখাব ভাবনাই ডেকে আনছে বিপদ, সাধারণ উপসর্গের আড়ালেই ওত পেতে রয়েছে নীরব ঘাতক – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
বুকে সামান্য ব্যথা হলে অনেকেই সেটিকে গ্যাসের সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। মাথা ঘুরলে মনে করেন গরমে একটু দুর্বলতা। আচমকা কথা জড়িয়ে গেলেও ভাবেন একটু বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। চিকিৎসকদের মতে, এই ‘কাল দেখা যাবে’ কিংবা ‘একটু অপেক্ষা করি’ মানসিকতাই এখন মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় নীরব ঘাতক হয়ে উঠছে। বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা দিনের পর দিন চিকিৎসা নিতে দেরি করার এই প্রবণতা পরিস্থিতিকে দ্রুত প্রাণঘাতী করে তুলছে।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, সেপসিস বা হিটস্ট্রোকের মতো গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময় নষ্ট হওয়ার অর্থ হলো শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া। অনেকেই রাতে শারীরিক সমস্যা অনুভব করলে ভাবেন রাতটুকু কোনোভাবে কাটিয়ে সকালে চিকিৎসকের কাছে যাবেন। আবার কেউ কেউ হাসপাতালে যাওয়ার ভয়ে কিংবা কাজের চাপে রোগ চেপে রাখেন। অনেকে আবার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই নিজে নিজে ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
রেড অ্যালার্ট এবং অবহেলার খেসারত
চিকিৎসকদের মতে, শরীরের কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণকে ‘রেড অ্যালার্ট’ বা চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে গণ্য করা উচিত। বুকব্যথা বা বুকে ভারী চাপ লাগা, হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট, কথা জড়িয়ে যাওয়া, শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, আচমকা তীব্র মাথাব্যথা, বারবার বমি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক রক্তপাতের মতো উপসর্গ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়। এগুলো মূলত স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, ব্রেন ইনজুরি বা মারাত্মক অভ্যন্তরীণ সংক্রমণের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না হলে রোগীর শরীরে স্থায়ী জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন স্ট্রোকের পর পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস, স্থায়ী হার্ট ড্যামেজ, মস্তিষ্কের ক্ষতি কিংবা অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হলেও তাকে দীর্ঘ সময় ভেন্টিলেটর বা জরুরি অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও এই দেরির কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
পারিবারিক অসচেতনতা ও করণীয়
ব্যক্তির পাশাপাশি অনেক সময় পরিবারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণেও রোগীর জীবন সংকটে পড়ে। তীব্র শারীরিক অসুস্থতার শুরুতে হাসপাতালে না গিয়ে অনেকেই প্রথমে আত্মীয়স্বজনদের সাথে আলোচনা করেন, ঘরোয়া টোটকা ব্যবহার করেন কিংবা স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে সাময়িক উপশমের ওষুধ এনে রোগীকে খাওয়ান। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনায় প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে মৃত্যুঝুঁকি এবং স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে চিকিৎসকেরা সচেতনতা বাড়ানোর ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন। যেকোনো হঠাৎ বা অস্বাভাবিক উপসর্গকে হালকাভাবে না নেওয়া এবং নিজে নিজে রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষের স্পষ্ট ধারণা থাকা এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যবস্থা রাখাই এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।
