কূটনীতির দাবার চালে জিনপিঙের বাজিমাত, বেজিং সফরে ট্রাম্পের অর্জন শুধুই ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
চিন সফরে গিয়ে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চালের কাছে কার্যত পরাস্ত হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অফ দ্য পিপল’-এ আয়োজিত এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের একাধিক কৌশলগত ব্যর্থতা এবং শি জিনপিঙের একাধিপত্যই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বরাজনীতিতে ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে আমেরিকার যে দাপট, ড্রাগনের দেশে গিয়ে তা অনেকটাই ম্লান হয়েছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মহল। অন্যদিকে, চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো এই সফর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ‘খোঁড়া দৈত্য’ হিসেবে কটাক্ষ করতেও ছাড়েনি।
ইরান ও তাইওয়ান ইস্যুতে হোঁচট
কূটনৈতিক মহলের ধারণা ছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সফরে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই ইস্যু— ইরান সংকট এবং তাইওয়ান পরিস্থিতি নিয়ে বড় কোনো রফাসূত্র মিলবে। তেহরানের অবরুদ্ধ করে রাখা হরমুজ প্রণালী খোলার ব্যাপারে চিনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু চিনের নিজস্ব খনিজ তেল আমদানির সিংহভাগই আসে ইরান থেকে। ফলে নিজের বাণিজ্যিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে ইরান ইস্যুতে আমেরিকার সুরের সঙ্গে সুর মেলায়নি বেজিং।
একইভাবে ব্যর্থতা এসেছে তাইওয়ান ইস্যুতেও। আমেরিকার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপরাষ্ট্রটির সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। কিন্তু বৈঠকে বসার আগে থেকেই চিনের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, যাতে তাইওয়ান নিয়ে কোনো ‘লক্ষ্মণরেখা’ অতিক্রম না করা হয়। চিনের এই মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে পড়ে বৈঠকে তাইওয়ান নিয়ে কোনো জোরালো অবস্থানই তৈরি করতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার সামরিক শক্তির ক্ষয় চিনের জন্য তাইওয়ান দখলের পথ আরও সুগম করে তুলল।
প্রযুক্তি ও বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্যের ইঙ্গিত
আমেরিকার শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের দল সঙ্গে নিয়ে গেলেও কৃত্রিম মেধা (এআই) বা উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বড় কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অধরাই রয়ে গেছে। আমেরিকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার মতো কোনো বড় সমঝোতার বদলে চিন কেবল সয়াবিন আমদানি বৃদ্ধির আশ্বাস দিয়েছে, যা মার্কিন শিবিরের জন্য কেবলই একটি ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ মেটালস) রফতানির ওপর চিনের যে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা নিয়ে কোনো রফায় আসতে পারেননি ট্রাম্প। উল্টো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তি যেমন— সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানের জন্য আমেরিকার বাজার চিনের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বাজারে চিনের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ আরও সহজ হলো।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রভাব
সফরের শুরু থেকেই প্রোটোকল ও বসার আসনে ট্রাম্পের চেয়ে নিজেকে উঁচুতে রেখে মার্কিন প্রতিনিধি দলের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ বজায় রেখেছিল বেজিং। এমনকি মার্কিন নিরাপত্তাকর্মী ও গণমাধ্যমকে আটকে রাখার মতো ঘটনাও ঘটেছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, বোয়িং বিমান বা জেনারেল ইলেকট্রিকের জেট ইঞ্জিন কেনার ব্যাপারে চিন মৌখিক সম্মতি জানিয়েছে, তবে বেজিংয়ের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
এই সফরের ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব যেমন প্রশ্নের মুখে পড়ল, তেমনই জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপিন্সের মতো মিত্র দেশগুলোর ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলো। আগামী সেপ্টেম্বরে জিনপিঙের সম্ভাব্য আমেরিকা সফরকে সামনে রেখে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের এই বেজিং সফরকে একটি বড় কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
