খামেনেই ১টি হাত কেন সর্বদাই চাদরে ঢেকে রাখতেন? – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
ইরানের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইর প্রয়াণের পর এখন বিশ্বজুড়ে চর্চায় তাঁর জীবনের নানা অজানা অধ্যায়। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে ইরানের শাসনভার সামলানো এই নেতার প্রায় প্রতিটি ছবিতেই একটি বিষয় অত্যন্ত রহস্যময় ঠেকত সাধারণ মানুষের কাছে। তিনি সর্বদা তাঁর ডান হাতটি একটি চাদর বা আলখাল্লার নিচে সযত্নে ঢেকে রাখতেন। কেন এই গোপনীয়তা? এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে চার দশক আগের এক ভয়ঙ্কর রক্তক্ষয়ী ইতিহাস।
সেই অভিশপ্ত ২৭ জুন এবং একটি ‘ঘাতক’ টেপ রেকর্ডার
ঘটনাটি ১৯৮১ সালের। আলি খামেনেই তখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হননি, ছিলেন দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট। ইরান-ইরাক যুদ্ধের উত্তাল সময়ে তিনি গিয়েছিলেন তেহরানের দক্ষিণ প্রান্তের একটি মসজিদে নামাজ পড়তে এবং অনুগামীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, মাঝারিপাল্লার উচ্চতার এক যুবক খামেনেইর সামনের টেবিলে একটি ছোট টেপ রেকর্ডার রেখে বোতাম টিপে দ্রুত সেখান থেকে সরে যায়।
মুহূর্তের মধ্যেই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা মসজিদ চত্বর। টেপ রেকর্ডারের ভেতরে লুকিয়ে রাখা শক্তিশালী বোমায় রক্তাক্ত হন খামেনেই। এই হামলায় তাঁর ফুসফুস এবং ভোকাল কর্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সবচেয়ে বেশি চোট লাগে তাঁর ডান হাতে। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করে তাঁর প্রাণ বাঁচাতে পারলেও খামেনেইর ডান হাতটি চিরতরে অবশ হয়ে যায়। সেই থেকে আমৃত্যু নিজের সেই অকেজো হাতটিকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে তিনি চাদর ব্যবহার করতেন।
‘ফুরকান গ্রুপ’ এবং সেই চিরকুট
বিস্ফোরণের পর তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা টেপ রেকর্ডারের ভেতর থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেন। সেখানে লেখা ছিল, “ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য ফুরকান গ্রুপের উপহার।” ফুরকান গ্রুপ ছিল তৎকালীন কট্টরপন্থী আয়াতুল্লাহ বিরোধী একটি জঙ্গি গোষ্ঠী। তারা খামেনেইকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু ভাগ্যের জোরে তিনি বেঁচে ফেরেন।
অদম্য জেদ ও বাম হাতে লেখার লড়াই
শারীরিক সক্ষমতা হারালেও খামেনেইর মানসিক দৃঢ়তা ছিল প্রশ্নাতীত। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, “বিপ্লবের জন্য আমার হাতের প্রয়োজন নেই, আমার মস্তিষ্ক আর জিহ্বা সচল থাকলেই যথেষ্ট।” ডান হাত কর্মক্ষমতা হারানোর পর তিনি সম্পূর্ণ নতুনভাবে বাম হাতে লেখা এবং দৈনন্দিন কাজ করার অভ্যাস রপ্ত করেন। এই অদম্য জেদই তাঁকে পরবর্তীকালে ইরানের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করেছিল।
দীর্ঘ শাসনামলের অবসান
৮৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা আলি খামেনেই রেখে গেলেন স্ত্রী মানসুরেহ খোজাস্তেহ এবং ছয় সন্তানকে। তাঁর মৃত্যুতে ইরানজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে—একাংশ যেমন শোকে মুহ্যমান, অন্য একাংশ আবার নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশায় বুক বাঁধছে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের সাঁড়াশি চাপের মুখে খামেনেই-পরবর্তী ইরান কোন পথে হাঁটে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।

