ডিম পাড়া থেকে ঘামের মতো দুধ নির্গমন, প্ল্যাটিপাস প্রকৃতির এক রহস্যময় বিস্ময়

প্রকৃতি বিচিত্র এবং রহস্যময়। এই বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ হলো প্ল্যাটিপাস। স্তন্যপায়ী হয়েও এদের ডিম পাড়া এবং ঘামের মতো দুধ বের করার বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের কয়েক দশক ধরে ভাবিয়ে তুলেছে। অস্ট্রেলিয়ার এই বিশেষ প্রাণীটি এক শরীরে বিভিন্ন প্রজাতির বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেঁচে আছে, যা বিবর্তনবাদীদের কাছে আজও এক পরম বিস্ময়।
বিবর্তনের জীবন্ত দলিল ও শারীরিক গঠন
বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘ওরনিথরিনচাস অ্যানাটিনাস’ (Ornithorhynchus anatinus) হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এরা অদ্ভুত এক প্রাণী। এদের সারা দেহ লোমে ঢাকা থাকলেও ঠোঁটটি হাঁসের মতো আর লেজ অনেকটা কানাডার জাতীয় প্রাণী বিভারের মতো। বর্তমানে বিশ্বে মাত্র দুটি গোষ্ঠী রয়েছে যারা স্তন্যপায়ী হয়েও ডিম পাড়ে, যার মধ্যে প্ল্যাটিপাস অন্যতম। বিজ্ঞানীরা এদের প্রাচীন স্তন্যপায়ী ‘মনোট্রিম’ গোষ্ঠীভুক্ত বলে চিহ্নিত করেছেন। এদের শরীরে বিবর্তনের আদিম চিহ্নগুলো এখনও বিদ্যমান।
সন্তান উৎপাদনে অনন্য বৈশিষ্ট্য
সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীরা সরাসরি সন্তান প্রসব করে, কিন্তু প্ল্যাটিপাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। প্রজনন সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, এরা পাখি ও সরীসৃপদের মতো নরম চামড়ার আবরণযুক্ত ডিম পাড়ে। ডিম ফোটার পর অত্যন্ত অপরিণত অবস্থায় বাচ্চা বের হয়, যারা সম্পূর্ণভাবে মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্ল্যাটিপাস বিবর্তনে পিছিয়ে পড়েনি বরং তারা স্বতন্ত্রভাবে বিবর্তিত হয়েছে, যার ফলে এদের মধ্যে আধুনিক এবং প্রাচীন—উভয় বৈশিষ্ট্যেরই সংমিশ্রণ ঘটেছে।
ঘামের মতো দুধ নির্গমন পদ্ধতি
প্ল্যাটিপাসকে স্তন্যপায়ী বলা হয় কারণ এরা সন্তানকে দুধ খাওয়ায়। তবে এদের দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতিটি অদ্ভুত। স্ত্রী প্ল্যাটিপাসের কোনো স্তনবৃন্ত নেই। পরিবর্তে তাদের স্তনগ্রন্থি সরাসরি ত্বকের ওপর উন্মুক্ত থাকে। বিশেষ নালীর মাধ্যমে দুধ বেরিয়ে পেটের ত্বকের খাঁজে জমা হয়। সেখান থেকেই বাচ্চারা চেটে চেটে দুধ পান করে। ত্বক থেকে সরাসরি বেরিয়ে আসায় একে দূর থেকে ঘামের মতো মনে হতে পারে, তবে এটি অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন আসল দুধ।
জলের তলায় শিকার ধরার অদ্ভুত ক্ষমতা
প্ল্যাটিপাস একটি আধা-জলজ প্রাণী। শিকার করার সময় এরা জলজ কাদামাটির ভেতর চোখ, কান এবং নাক বন্ধ করে দেয়। দৃষ্টিহীন অবস্থায় শিকার ধরতে এরা ব্যবহার করে এদের বিশেষ ধরনের সংবেদনশীল ঠোঁট। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ইলেকট্রোরিসেপশন’।
- জলের তলায় প্রাণীর নড়াচড়ায় উৎপন্ন ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ এরা শনাক্ত করতে পারে।
- ঠোঁটের ত্বকে থাকা বিশেষ ইলেকট্রোরিসেপটর এই সূক্ষ্ম সংকেত গ্রহণ করে।
- জলের চাপ এবং তরঙ্গের সংমিশ্রণ ব্যবহার করে এরা নিখুঁতভাবে শিকার ধরে।
বিলুপ্তির পথে প্রকৃতির এই বিস্ময়
বিবর্তনের লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাস বহন করা এই প্রাণীটি বর্তমানে শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়াতে সীমাবদ্ধ। প্রকৃতির এই আশ্চর্য সৃষ্টি এখন দ্রুত বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই বিরল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জীববিজ্ঞানীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং যথাযথ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এক ঝলকে
- পরিচয়: অস্ট্রেলিয়ার প্রাচীন ‘মনোট্রিম’ গোষ্ঠীভুক্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী।
- বিচিত্র গঠন: হাঁসের মতো ঠোঁট, বিভারের মতো লেজ এবং লোমশ শরীর।
- প্রজনন: স্তন্যপায়ী হওয়া সত্ত্বেও ডিম পাড়ে এবং তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়।
- দুধ পানের পদ্ধতি: স্তনবৃন্তহীন ত্বক থেকে নির্গত দুধ বাচ্চারা চেটে খায়।
- শিকার কৌশল: ঠোঁটের সাহায্যে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ (ইলেকট্রোরিসেপশন) ব্যবহার করে শিকার ধরে।
- বর্তমান অবস্থা: বাসস্থান সংকট ও অন্যান্য কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
