দেড় লাখি ক্যান্সারের ওষুধে শুধু জল, ধরা পড়ল ভয়ংকর প্রতারক চক্র!

ক্যান্সার চিকিৎসায় ভয়ংকর জালিয়াতি: দেড় লাখের ইনজেকশনের বদলে অ্যান্টি-ফাঙ্গাল, জড়িত হাসপাতাল কর্মী
ভারতে ক্যান্সারের চিকিৎসায় এক ভয়াবহ জালিয়াতির চক্র উন্মোচিত হয়েছে, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি দিল্লি পুলিশের একটি অভিযানে জানা গেছে, ক্যান্সার রোগীদের দেড় লক্ষ টাকা মূল্যের দামী ‘ইমিউনোথেরাপি’ ইনজেকশনের বদলে শরীরে পুশ করা হচ্ছে সাধারণ অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ওষুধ। এই প্রতারণা চক্রে পাঞ্জাব ও দিল্লির স্বনামধন্য হাসপাতালের কর্মীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে, যা চিকিৎসার নামে অসহায় মানুষের জীবন নিয়ে এক নিষ্ঠুর খেলার নগ্ন রূপ প্রকাশ করেছে।
জালিয়াতির নেপথ্যে সুসংগঠিত চক্র
এই জালিয়াতি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং পেশাদারভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তদন্তে চক্রের কার্যক্রমের তিনটি প্রধান ধাপ উঠে এসেছে:
- ব্যবহৃত ভায়াল সংগ্রহ: নামী হাসপাতাল থেকে ব্যবহৃত বা আংশিক খালি ইনজেকশনের বোতল (ভায়াল) সংগ্রহ করা হতো।
- রিফিলিং ও সিলিং: সংগৃহীত খালি বোতলগুলোতে সস্তা অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ওষুধ ভরে সেগুলোকে হুবহু আসল ইনজেকশনের মতো সিল করে দেওয়া হতো।
- বিপণন: আসল দামের চেয়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে ‘ডিসকাউন্ট’-এর প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের কাছে এই নকল ওষুধ বিক্রি করা হতো। এর ফলে বহু রোগী প্রতারিত হতেন এবং তাঁদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ত।
হাসপাতালের কর্মীদের আঁতাত ও প্রতারণার কৌশল
তদন্তে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, দিল্লির রাজীব গান্ধী ক্যান্সার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কিছু ফার্মাসিস্ট এবং অন্যান্য কর্মী সরাসরি এই চক্রে যুক্ত। পারভেজ নামক এক প্রাক্তন ফার্মাসিস্টকে এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে হাসপাতালের ভেতরের কর্মীদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে খালি এবং ভরা ওষুধের বোতল বাইরে পাচারের জন্য ব্যবহার করত। একটি খালি বোতলের জন্য ৩ হাজার এবং ভরা বোতলের জন্য ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দেওয়া হতো বলে জানা গেছে। এই আঁতাতের কারণে ভেতরের তথ্য এবং সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতারণা আরও সহজ হতো।
রোগীদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ও মৃত্যু
এই জালিয়াতির শিকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ, যাঁদের মধ্যে অনেকেই ক্যান্সারের মতো মারণ রোগে ভুগছেন। পাঞ্জাবের এক গৃহবধূকে ‘কিট্রুডা’ নামক যে দামী ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, পরে জানা যায় তা ছিল সম্পূর্ণ নকল। বিহারের এক নারী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে সস্তায় এই নকল ইনজেকশন কিনে ব্যবহারের পর মারা যান। ক্যান্সার রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই দুর্বল থাকে। তার ওপর সঠিক ওষুধের বদলে ক্ষতিকারক বা অকার্যকর উপাদান শরীরে প্রবেশ করায় তাঁদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এটি শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়, বরং রোগীদের জীবনের সাথে চরম অবহেলা।
ব্যবস্থার দুর্বলতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত বা খালি ওষুধের বোতল ধ্বংস করার কোনো কড়া নিয়ম বা নজরদারি না থাকায় এই চক্রটি বছরের পর বছর তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছে। যদিও বর্তমানে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি শুরু হয়েছে, তবুও ভারতের বিশাল ওষুধের বাজারে এই ধরনের আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক বন্ধ করা এখনও এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই ঘটনা স্বাস্থ্যসেবা খাতে কঠোর নজরদারি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
একঝলকে
- মূল প্রতারণার ধরন: দেড় লক্ষ টাকা মূল্যের ক্যান্সারের ইনজেকশনের বদলে সাধারণ অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ওষুধ পুশ।
- প্রতারণার কৌশল: ব্যবহৃত বোতলে নকল ওষুধ ভরে পুনরায় সিল করে বিক্রি।
- চক্রের বিস্তার: দিল্লি ও পাঞ্জাবের বিভিন্ন বড় হাসপাতাল এবং অনলাইন বাজার।
- মূল অভিযুক্ত: পারভেজ নামক প্রাক্তন ফার্মাসিস্ট ও হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মী।
- রোগীদের ওপর প্রভাব: শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং মৃত্যুর ঘটনা।
- ওষুধের নাম: কিট্রুডা (Keytruda)।
