ধর্মীয় আরাধনা নাকি রাজনৈতিক উৎসব: তিন দশকে যেভাবে বদলে গেল দুর্গাপুজোর মেজাজ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
কয়েক দশক আগে এক বাংলা পত্রিকায় ১৪০০ বঙ্গাব্দের দুর্গাপুজো নিয়ে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিন্তাভাবনা তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে প্রশ্ন ছিল—ভবিষ্যতে বাংলায় দুর্গাপুজো আদৌ পালিত হবে কি না, বা হলে তার রূপ কেমন হবে? আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের পুজো ঘিরে সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমার রূপ, এমনকি উৎসবের সময় মানুষের খাবারের পদ। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এই বিতর্ক যেমন তীব্র হয়েছে, তেমনই দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নানা রাজনৈতিক সমীকরণ।
তিন দশকের বিবর্তন: ভক্তি থেকে থিম কালচার
১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কলকাতা বা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে থিম পুজোর তেমন চল ছিল না। ষষ্ঠী থেকে দশমী—এই চার-পাঁচ দিনেই সীমাবদ্ধ থাকত পুজো। অনেক মণ্ডপেই ষষ্ঠীর দিন প্রতিমার হাতে অস্ত্র দেওয়া হতো না, সপ্তমীর বোধনের পরেই দেবী অস্ত্রসজ্জিত হতেন। তবে ১৯৯৯-২০০০ সালের দিকে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের হাত ধরে তৃতীয় বা চতুর্থীতে উদ্বোধনের নতুন সংস্কৃতি শুরু হয়, যা পরবর্তীতে অন্যান্য ক্লাবগুলিও অনুসরণ করতে থাকে। ফলে পুজোর ব্যাপ্তি চার দিন থেকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮-১০ দিনে।
২০২২ সালে কসবায় ভাঁড় দিয়ে তৈরি একটি থিম মণ্ডপ ঘিরে বিপুল জনসমাগম হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে প্রতিমা বিসর্জনের পরেও শুধু মণ্ডপ দেখতে উপচে পড়া ভিড় সামলাতে পুলিশকে বাধ্য হয়ে মণ্ডপটি ভেঙে ফেলতে হয়। এর পর থেকেই থিম পুজোর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে।
পুজোয় রাজনীতির ছায়া
পুজোয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ কিন্তু নতুন নয়, এর সূচনা বাম আমলেই। প্রকাশ্যে পুজোয় যুক্ত না থাকলেও বাম নেতৃত্ব পিছন থেকে প্রভাব বিস্তার করত এবং দুর্গাপুজোকে ‘উৎসব’ হিসেবে তুলে ধরার প্রক্রিয়া তখন থেকেই শুরু হয়। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার” বার্তাটি রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তৎকালীন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম দুর্গাপুজোকে ‘উৎসব’ বলে চিহ্নিত করলে, তৎকালীন প্রবীণ মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় তার বিরোধিতা করেছিলেন।
তৃণমূল জমানায় দেখা যায় সরকারি প্রকল্প যেমন—’কন্যাশ্রী’ ইত্যাদির আদলে থিম মণ্ডপ তৈরি। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং দেবীপক্ষ শুরুর আগেই শত শত পুজোর উদ্বোধন, প্রতিমার চক্ষুদান, এমনকি মণ্ডপে তাঁর লেখা ও সুর করা গান বাজানোর প্রবণতা তৈরি হয়। ক্লাবগুলিকে রাজ্য সরকারের আর্থিক অনুদান প্রদানও শুরু হয়, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল নানান শর্ত ও রাজনীতি। সরকারি নির্দেশেই নির্দিষ্ট হতে থাকে পুজোর সময়সীমা ও বিসর্জনের দিনক্ষণ। সেই সঙ্গে কতিপয় নেতার প্রভাব ও দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের নানা অভিযোগ উঠতে থাকে।
বর্তমানে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুর্গাপুজো আবার কোন পথে পরিচালিত হবে, তা সময়ই বলবে। তবে পুজোকে কেবল একটি সর্বজনীন ‘উৎসব’ বানাতে গিয়ে যেন তার আসল আধ্যাত্মিকতা ও শক্তির আরাধনা হারিয়ে না যায়—এমনটাই মনে করছেন পুজোপ্রেমীরা। কারণ, ঐতিহ্যের সুরক্ষায় আরাধনার মূল সারমর্ম ধরে রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি।
