নেই পারমিট, লাইসেন্স! মুর্শিদাবাদের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ‘লাদেন’ – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
‘হাঁস’ আর ‘সজারু’ মিলে যেমন তৈরি হয়েছিল ‘হাঁসজারু’, তেমনই সাধারণ তিন চাকার ভ্যানে ইঞ্জিন বসিয়ে তৈরি এক আজব যান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার রাস্তায়। না আছে রেজিস্ট্রেশন, না আছে রুট পারমিট—তবুও দাপট একবিন্দু কমেনি। স্থানীয়রা কেউ একে ডাকেন ‘লাদেন’, আবার কেউ বলেন ‘লছিমন’। দেড় দশক আগে কুখ্যাত সন্ত্রাসী বিন লাদেন খতম হলেও, মুর্শিদাবাদের গ্রামীণ সড়কে আজও রমরমিয়ে চলছে এই ‘লাদেন ভ্যান’।
নাম কেন ‘লাদেন’? সরকারি খাতায় এই যানের কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরোনো গ্যারেজের মালিক ও প্রবীণদের মতে, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলার পর পরই বাজারে এই ত্রিচক্রযানের আগমন। অননুমোদিত এই বেপরোয়া ইঞ্জিনের গাড়ির নাম লোকমুখে হয়ে যায় ‘লাদেন’। বিকট শব্দ, কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা চালচলন আর বেপরোয়া গতির কারণেই মূলত এমন অদ্ভুত নামকরণ বলে মনে করেন অনেকে।
এক যানে বহু রূপ: গ্রামবাংলার মুশকিল আসান নামে ‘ভিলেন’ হলেও ব্যবহারের দিক থেকে মুর্শিদাবাদের বহু মানুষের কাছে এটিই একমাত্র ভরসা। ডোমকল, রানিনগর, জলঙ্গি কিংবা হরিহরপাড়ার মতো প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় যেখানে বাস বা ট্রেকার নিয়মিত চলে না, সেখানে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম এই লছিমন।
- সকালে যাত্রী নিয়ে ছুটলে এটি যাত্রীবাহী গাড়ি।
- খুদে পড়ুয়াদের নিয়ে স্কুলে ছুটলে বনে যায় পুলকার।
- রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে পৌঁছে দিলে তা অ্যাম্বুল্যান্স।
- আর মালপত্র চাপাল তো নিমেষেই মালগাড়ি!
জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে চরম বিপদ মূলত পণ্য পরিবহণের জন্য তৈরি এই যানের অবাধ যাত্রী বহন নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করা এবং বেপরোয়া চালনার কারণে ঘন ঘন ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সম্প্রতি নদিয়ার হোগলবেড়িয়ায় লছিমনের ধাক্কায় পা হারিয়েছেন এক প্রৌঢ়। ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের প্রশ্ন, অনুমোদনহীন এই গাড়িগুলো এতদিন ধরে কীভাবে চলছে? প্রশাসন কি আরও বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষা করছে?
অন্যদিকে, বাস ও ট্রেকার মালিকদের অভিযোগ—নিয়ম না মেনে অননুমোদিত গাড়ির দাপটের ফলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বৈধ পরিবহণ ব্যবসায়ীরা। একাধিকবার ধর্মঘট ও পুরসভার তরফে প্রচার চালিয়েও চালকদের দাপট কমানো যায়নি।
প্রশাসনের কড়া অবস্থান ও সরকারের আল্টিমেটাম বারবার দুর্ঘটনা ও যানজটের অভিযোগে এবার নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলা প্রশাসন থেকে কড়া ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্য ও জাতীয় সড়কে ইতিমধ্যেই টোটো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এবার অবৈধ মোটর ভ্যানগুলোর বিরুদ্ধেও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কোনো ধরনের বেআইনি যান আর রাস্তায় চলতে দেওয়া হবে না। নিয়ম মেনে বৈধ সরকারি লাইসেন্স ও দূষণমুক্ত গাড়ি ব্যবহারের জন্য চালকদের ৩ মাসের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
আমেরিকার ‘অপারেশন নেপচুন’-এ খতম হয়েছিল কুখ্যাত অপরাধী লাদেন। এখন দেখার, প্রশাসন ও পরিবহণ দপ্তরের এই কঠোর পদক্ষেপে মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার রাজ্য সড়ক থেকে বেআইনি ‘লাদেন ভ্যান’-এর দাপট চিরতরে বন্ধ হয় কি না।
