পেলে বা মারাদোনা নন, ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরার মুকুট কি তবে লিওনেল মেসির মাথায়? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
ফুটবলের ইতিহাসে ‘গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম’ বা সর্বকালের সেরা কে, তা নিয়ে বিতর্ক চিরন্তন। এক যুগের পেলে কিংবা মারাদোনার সঙ্গে আধুনিক যুগের ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দ্বৈরথ ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘকাল ধরে আন্দোলিত করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও সমর্থকদের বড় অংশের দাবি, লিওনেল মেসি তাঁর অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দিয়ে এই চিরন্তন বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর ধারাবাহিকতা এবং বর্তমানের দুর্দান্ত ফর্ম তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
অদম্য লড়াই ও রূপকথার উত্থান
আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া লিওনেল মেসির শৈশব কাটে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। ছোটবেলায় ‘গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি’ নামের একটি জটিল ও ব্যয়বহুল রোগে আক্রান্ত হন তিনি, যার চিকিৎসার খরচ জোগানো তাঁর পরিবারের পক্ষে আসাম্ভব ছিল। এই সংকটের মাঝেই মেসির ফুটবল প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে স্পেনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এফসি বার্সেলোনা তাঁর চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেয় এবং নিজেদের বিখ্যাত ‘লা মাসিয়া’ একাডেমিতে তাঁকে জায়গা দেয়। এই ঘটনাই মেসির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি ফুটবল বিশ্বের সমস্ত বড় রেকর্ড নিজের নামে করে নেন।
বিশ্বকাপে রেকর্ডের মহোৎসব ও প্লে-মেকিং জাদু
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাতীয় দলের হয়ে কোপা আমেরিকা ও ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে মেসি নিজের ট্রফি ক্যাবিনেট পূর্ণ করেছেন। তবে তাঁর জাদু এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপেও মেসির পায়ের জাদু অব্যাহত রয়েছে, যেখানে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬-তে, যা জার্মানির কিংবদন্তী স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোজ়ের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ডকে স্পর্শ করেছে।
মেসির খেলার মূল বৈশিষ্ট্য শুধু বল জালে জড়ানো নয়, বরং ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি মাঠে ধীরস্থিরভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ পর্যবেক্ষণ করেন এবং মুহূর্তের মধ্যে নিখুঁত পাস বা ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে ডিফেন্স ভেঙে ফেলেন। তাঁর এই অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতা নিয়ে বার্সেলোনার প্রাক্তন কোচ পেপ গুয়ার্দিওলা মন্তব্য করেছিলেন যে, এত গতিতে বল পায়ের সঙ্গে আটকে রাখা কার্যত পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করার মতো।
রোনাল্ডো বনাম মেসি দ্বন্দ্বের নতুন সমীকরণ
দীর্ঘদিন ধরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গে মেসির তুলনা চললেও মাঠের কার্যকারিতার বিচারে অনেকেই এখন মেসিকে এগিয়ে রাখছেন। রোনাল্ডো বক্সের মধ্যে একজন ভয়ঙ্কর গোলদাতা হলেও মেসি একই সাথে একজন বিশ্বমানের ফিনিশার এবং প্লে-মেকার। কেরিয়ারে ৮০০-র বেশি গোল করার পাশাপাশি ফুটবল ইতিহাসের সর্বাধিক অ্যাসিস্টের তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকা প্রমাণ করে যে, তিনি সতীর্থদের দিয়ে গোল করাতেও সমান পারদর্শী। গোল ও অ্যাসিস্টের এই অনন্য মেলবন্ধন এবং আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে একের পর এক রেকর্ড ভাঙার এই প্রবণতা ফুটবল বিশ্বে মেসির প্রভাবকে আরও সুদূরপ্রসারী করে তুলছে, যা তাঁকে ফুটবল শিল্পের এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত করেছে।
