মদ্যপানের নেশাই ডেকে আনছে মারণ রোগ, যক্ষ্মা বাড়বাড়ন্ত দেখে কপালে ভাঁজ স্বাস্থ্যদপ্তরের – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নিজস্ব সংবাদদাতা, কাটোয়া: অতিরিক্ত মদ্যপানের আসক্তি কি তবে কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে কাটোয়াবাসীর জন্য? রাজ্য জুড়ে যখন স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রচার তুঙ্গে, ঠিক তখনই কাটোয়া মহকুমায় যক্ষ্মা বা টিবি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিশেষ করে মদ্যপানে আসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেই এই মারণ রোগের সংক্রমণ সবথেকে বেশি দেখা যাচ্ছে বলে স্বাস্থ্যদপ্তরের সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
কাটোয়া মহকুমা স্বাস্থ্যদপ্তরের পক্ষ থেকে কাটোয়া শহর, দাঁইহাট এবং কাটোয়া-১ ও ২ ব্লকের প্রায় ২ লক্ষ ৯০ হাজার বাসিন্দার ওপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেই রিপোর্টের পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে শুধুমাত্র কাটোয়া শহর ও কাটোয়া-১ ব্লকেই ৩৯৫ জন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন। পিছিয়ে নেই কাটোয়া-২ ব্লকও, সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১৪২। এছাড়া কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে এসে গত এক বছরে ১৭৩ জনের শরীরে যক্ষ্মার জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে ২ শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিক হলেও, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সংক্রমণের হার রীতিমতো ভীতিপ্রদ।
শহরের বাগানেপাড়া, জামাইপাড়া, কেশিয়া, হাজরাপুর কলোনি, মণ্ডলপাড়া ও কাটোয়াপাড়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলিতে এই রোগের থাবা সবথেকে চওড়া। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যক্ষ্মা একটি বায়ুবাহিত রোগ হলেও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কাটোয়ার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে আক্রান্তদের লিভার ও ফুসফুস দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার সুযোগ নিচ্ছে যক্ষ্মার জীবাণু। এছাড়া ধূমপান ও চরম অপুষ্টি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালের সুপার বিপ্লব মণ্ডল এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, “কাটোয়ায় যক্ষ্মার প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আমরা লাগাতার সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছি এবং রোগীদের নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার ওপর জোর দিচ্ছি। মদ্যপানের নেশা এই রোগের চিকিৎসায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৫ সালের গ্লোবাল যক্ষ্মা রিপোর্ট বলছে, ভারতে সামগ্রিকভাবে যক্ষ্মার প্রকোপ ২১ শতাংশ কমেছে এবং চিকিৎসা পরিষেবার মান ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সারা দেশে মৃত্যুর হার কমলেও কাটোয়ায় কেন উল্টো ছবি দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে ধন্দে স্বাস্থ্যমহল। স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মদ্যপানের নেশায় বুঁদ হয়ে রোগীরা সঠিক সময়ে ওষুধ খাচ্ছেন না, আবার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আক্রান্তের সংস্পর্শে এসে সুস্থ মানুষও সংক্রমিত হচ্ছেন।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, আক্রান্তদের সিংহভাগই আর্থিকভাবে অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া পরিবারের সদস্য। জীবনযাত্রার মান এবং সচেতনতার অভাবই এই সংকটের মূলে। স্বাস্থ্যদপ্তরের পক্ষ থেকে এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে সোয়াব টেস্ট এবং কাউন্সিলিংয়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে যাতে এই সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব হয়।

