চার মাস ধরে ঘরে মেয়ের মৃতদেহ আগলে বাবা, উদ্ধার কঙ্কালসার দেহাবশেষ

কলকাতার রবিনসন স্ট্রিট কাণ্ডের পুনরাবৃত্তি এবার উত্তরপ্রদেশের মিরাটে। এক যন্ত্রণাদায়ক ও রোমহর্ষক ঘটনায় ৩৪ বছর বয়সী তরুণী প্রিয়াঙ্কার কঙ্কালসার দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিজ বাড়িতেই প্রায় চার মাস ধরে মেয়ের মৃতদেহ আগলে রাখার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বাবা উদয় ভান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাটি কেবলমাত্র একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুই নয়, বরং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর সংকটের দিকটিও সামনে নিয়ে এসেছে।

যেভাবে প্রকাশ্যে এল ঘটনাটি

প্রিয়াঙ্কা ও তাঁর বাবা বেগম বাগের একটি বাড়িতে থাকতেন। আত্মীয়দের বয়ান অনুযায়ী, গত চার মাস ধরে ওই বাড়িটি তালাবন্ধ অবস্থায় ছিল। দীর্ঘ সময় বাবা ও মেয়ের কোনো খোঁজ না মেলায় পরিবারের সদস্যরা উদয় ভানকে খুঁজতে শুরু করেন। অবশেষে একটি চায়ের দোকানে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। মেয়ের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে জানান যে, প্রিয়াঙ্কা দেরাদুনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে আত্মীয়দের চাপের মুখে তিনি স্বীকার করেন যে, প্রিয়াঙ্কার মৃত্যু হয়েছে এবং দেহটি ঘরের ভেতরেই রয়েছে।

দেহ লুকিয়ে রাখার কৌশল ও প্রতিবেশীদের বয়ান

বাড়ির ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ানোর কথা থাকলেও চার মাস ধরে কেউ বিষয়টি আঁচ করতে পারেনি। অভিযুক্ত উদয় ভান পুলিশকে জানিয়েছেন, পচনজনিত দুর্গন্ধ চাপা দেওয়ার জন্য তিনি ঘরের ভেতর নিয়মিত সুগন্ধি স্প্রে করতেন। প্রতিবেশীদের সাথে এই পরিবারের যোগাযোগ ছিল নগণ্য, যা এই দীর্ঘ গোপনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে:

  • প্রিয়াঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
  • চিকিৎসার জন্য তাঁর বাবা প্রায়ই তাঁকে রিকশায় করে বাইরে নিয়ে যেতেন।
  • মৃত্যুর পর প্রথম ৩-৪ দিন বাবা মৃতদেহের সাথেই ঘরে অবস্থান করেছিলেন।

পুলিশের পদক্ষেপ ও প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ

খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তালা ভেঙে হাড়হিম করা দৃশ্য দেখতে পায়। ঘরটি পুরনো কাগজপত্র এবং আবর্জনায় ঠাসা ছিল, যার মাঝখান থেকে প্রিয়াঙ্কার কঙ্কালসার অবশেষ উদ্ধার করা হয়। প্রিয়াঙ্কার খুড়তুতো ভাই বিশ্বজিৎ বিশ্বাস নিশ্চিত করেছেন যে, প্রিয়াঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। পুলিশ দেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ ও সময় জানার চেষ্টা করছে।

ঘটনার সামাজিক ও মানসিক প্রভাব

এই ঘটনাটি সমাজের এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে। রবিনসন স্ট্রিটের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে এটি প্রমাণ করে যে, অতিমাত্রায় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কীভাবে মানুষকে বাস্তবের জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। প্রিয়জনের মৃত্যু মেনে নিতে না পারা অথবা আইনি জটিলতার ভয় থেকে দেহ আগলে রাখার এই মানসিক প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই ঘটনার তদন্তে মৃতার বাবার মানসিক অবস্থাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এক ঝলকে

  • স্থান: মিরাট, উত্তরপ্রদেশ।
  • মৃতার নাম: প্রিয়াঙ্কা (৩৪ বছর)।
  • অভিযুক্ত: উদয় ভান বিশ্বাস (বাবা)।
  • দেহ উদ্ধারের সময়: মৃত্যুর প্রায় ৪ মাস পর।
  • পদ্ধতি: পচনের দুর্গন্ধ ঢাকতে সুগন্ধি স্প্রে ব্যবহার।
  • প্রেক্ষাপট: দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *