যাদবপুর ক্যাম্পাসে কুকুর-বেড়ালকে যত্রতত্র খাওয়ানো নিষিদ্ধের প্রস্তাব! উপাচার্যকে ৫৮০ জনের স্বাক্ষর সম্বলিত প্রতিবাদপত্র

জ্বালানির ‘রাম ছ্যাঁকা’য় সিএনজি-র লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি এবং টলিউড অভিনেতা সোহমের বিরুদ্ধে বালুরঘাট থানায় ১৫ লক্ষ টাকা প্রতারণার বিস্ফোরক খবরের মাঝেই, এবার তিলোত্তমার অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University) চত্বর এক নজিরবিহীন দ্বন্দ্বে উত্তাল হয়ে উঠল। ক্যাম্পাস চত্বরে কুকুরের কামড়ে এক পড়ুয়ার আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া তীব্র আতঙ্কের জেরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিকল্যাণ কমিটি (Animal Welfare Committee) ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে যেখানে-সেখানে কুকুর ও বেড়ালকে খাওয়ানোর ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারির এক বিতর্কিত প্রস্তাব এনেছে। আর এই প্রস্তাব ঘিরেই কার্যত আড়াআড়ি বিভক্ত হয়ে গেছে যাদবপুর। এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে উপাচার্যকে (VC) ৫৮০ জনের গণস্বাক্ষর সম্বলিত এক কড়া প্রতিবাদপত্র জমা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মচারী ও পশুপ্রেমী পড়ুয়ারা।
একদিকে যখন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের ভুয়ো নাম ছাঁটতে নবান্ন ‘মিশন মোড’-এ কাজ করছে এবং অন্যদিকে দক্ষিণ বঙ্গে চরম দাবদাহের মাঝেই পাঁচ দিন পর কালবৈশাখীর পূর্বাভাস মিলেছে— সেই চেনা সামাজিক ও প্রাকৃতিক গরমের সমান্তরালে যাদবপুরের এই ‘অ্যানিম্যাল রাইটস’ বিতর্ক এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
কামড়ের আতঙ্ক বনাম সহমর্মিতার সংস্কৃতি, অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের অভিযোগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও রেজিস্টার দফতর থেকে জানা গেছে, বিগত কয়েকদিনে ক্যাম্পাসের ভেতরে বেশ কিছু পথকুকুরের আচরণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন পড়ুয়াদের একাংশ। এর পরেই প্রাণিকল্যাণ কমিটির তরফ থেকে যত্রতত্র খাবার ছড়ানো বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়।
তবে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধেই এবার একজোট হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিশিষ্ট অধ্যাপক ও পশুপ্রেমীরা:
- ব্যক্তিগত খরচে নির্বীজকরণ: যাদবপুরের বিশিষ্ট ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ গুপ্ত স্পষ্ট জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসের কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষার জন্য তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডের ভরসায় বসে না থেকে, সম্পূর্ণ নিজেদের ব্যক্তিগত পকেটের খরচে ইতিমধ্যেই ১৫টি কুকুরের সফল নির্বীজকরণ (Sterilization) এবং টিকাকরণ করিয়েছেন।
- আইনি ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি: প্রতিবাদীদের মূল বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্ট ও অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী প্রাণীদের খাবার দেওয়া হুট করে বন্ধ করে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। এভাবে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিলে ক্ষুধার্ত কুকুরগুলি আরও বেশি হিংস্র ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। তাই এই সিদ্ধান্ত যেমন অবৈজ্ঞানিক, ঠিক তেমনই যাদবপুরের দীর্ঘদিনের চেনা ‘সহমর্মিতার সংস্কৃতি’রও চরম পরিপন্থী।
রাজনৈতিক ও শিক্ষাবিদদের মতে, একদিকে যখন ভাটপাড়া ও হালিশহরে পুরবোর্ড রক্ষা করতে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ড্যামেজ কন্ট্রোল বৈঠক এবং দিল্লি সফরে মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিওর কোয়াড এজেন্ডা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর চর্চা চলছে— সেই হাই-প্রোফাইল খবরের ভিড়ে যাদবপুর ক্যাম্পাসের এই পথকুকুর বিতর্ক আমজনতার নজর কেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য অনুযায়ী কোনো কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপানোর বদলে, আলোচনার মাধ্যমে ক্যাম্পাসের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় ‘ফিডিং জোন’ (Feeding Zones) তৈরি করে এই সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান খোঁজা সম্ভব কি না, এখন সেটাই দেখার।
