লেটেস্ট নিউজ

শেষযাত্রায় সঙ্গী শুধুই পচনশীল গন্ধ! ৫০ দিনে ২০ প্রবীণের মর্মান্তিক পরিণতিতে কাঁপছে সমাজ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

নিজস্ব প্রতিবেদন, বিধাননগর: আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য আর বিদেশের হাতছানি কি তবে কেড়ে নিচ্ছে আমাদের ন্যূনতম মানবিকতা? প্রশ্নটা উসকে দিয়েছে বিধাননগর মর্গ থেকে আসা সাম্প্রতিক এক শিউরে ওঠা পরিসংখ্যান। গত মাত্র ৫০ দিনে এই মর্গে এসেছে অন্তত ২০টি পচনশীল মৃতদেহ, যাদের প্রত্যেকের বয়স ৬৫ থেকে ৯৫ বছরের মধ্যে। ঘরের দরজা ভেঙে যখন পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করেছে, ততক্ষণে শরীরের পচন ধরেছে, আর বাতাসে মিশেছে একাকীত্বের বিষাদ।

কেন এই নিঃসঙ্গ মৃত্যু?

তদন্তে নেমে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে উঠে আসছে এক ভয়ঙ্কর সামাজিক চিত্র। মৃতদের অধিকাংশেরই সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত এবং বর্তমানে ভিন রাজ্য বা বিদেশে কর্মরত। কেরিয়ারের ইঁদুরদৌড়ে সামিল হয়ে তাঁরা ভুলেই গিয়েছেন বাড়িতে পড়ে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কথা। যোগাযোগ বলতে সেটুকুই, যা প্রয়োজনের খাতিরে করতে হয়। ফলে অসুস্থতায় জল দেওয়ার মতো কেউ পাশে নেই, এমনকি মৃত্যুর কয়েকদিন পরেও কারও কাছে সেই খবর পৌঁছায়নি। প্রতিবেশীরা যখন পচা গন্ধ সহ্য করতে না পেরে পুলিশে খবর দিয়েছেন, তখনই সামনে এসেছে এই চরম বাস্তব।

সমাজবিদের চোখে আধুনিকতার অভিশাপ

প্রখ্যাত সমাজবিদ অভিজিৎ মিত্র এই ঘটনাকে সমাজের চরম অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, “সন্তানকে মানুষ করে বিদেশে পাঠানোর পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াটা এখন এক অদ্ভুত পরিহাসে পরিণত হয়েছে। আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আত্মকেন্দ্রিকতা। আগে পাড়া-প্রতিবেশীরা একে অপরের খবর রাখতেন, কিন্তু এখন সবাই নিজের জগৎ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে পাশের ঘরে কেউ মারা গেলেও খবর থাকে না।” সম্পর্কের এই টানাপোড়েন আর একাকীত্বই প্রবীণদের ঠেলে দিচ্ছে মানসিক অবসাদ ও অকাল মৃত্যুর দিকে।

প্রতিবেশীদের উদাসীনতা বনাম মানবিকতা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী অকপটে স্বীকার করেছেন বর্তমান সময়ের কঠোর সত্য। তাঁর কথায়, “সবারই তো নিজের জীবন আছে। তাঁদের ছেলে-মেয়েরাই যেখানে খবর রাখে না, সেখানে আমরা কেন অন্যের পারিবারিক বিষয়ে নাক গলাতে যাব?” এই ‘নাক না গলানোর’ মানসিকতাই আজ প্রবীণদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের পাশে মানুষের দাঁড়ানোর সেই পুরনো প্রথা আজ যেন ডাস্টবিনে ঠাঁই পেয়েছে।

প্রশাসনের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা

বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা নিয়মিত ক্যাম্প করছেন এবং নজরদারি চালাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে একাকী থাকা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার চেষ্টাও করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের প্রশ্ন—একটি পরিবারের অন্তরের শূন্যতা কি শুধু পুলিশ দিয়ে ভরাট করা সম্ভব?

সমাজের কাছে বড় প্রশ্ন

বিজ্ঞান এগিয়েছে, বেড়েছে জিডিপি, কিন্তু কিমার্থ এই প্রগতি যদি নিজের জন্মদাত্রী বা জন্মদাতাকে শেষ বয়সে একটু যত্ন না দেওয়া যায়? বিধাননগরের এই ২০টি প্রাণহীন দেহ আজ সমাজের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি একাকীত্বের এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছি যেখানে মৃত্যুর পর কান্নার লোকটুকুও মিলবে না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *