সংসদে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় নারীশক্তি, লোকসভায় কি এবার প্রমীলা বাহিনীর জয়জয়কার?

সংসদে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় নারীশক্তি, লোকসভায় কি এবার প্রমীলা বাহিনীর জয়জয়কার?

ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন যুগ: মহিলা সংরক্ষণ বিল ও সংসদীয় গণতন্ত্রের এক ঐতিহাসিক বাঁকবদল

ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে নারীশক্তির ক্ষমতায়ন ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কেন্দ্র সরকার এক বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল’ বা নতুন সাংবিধানিক সংশোধনী বিল লোকসভায় পেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আসন সংখ্যায় বড় রদবদল

প্রস্তাবিত এই বিলের মূল লক্ষ্য হলো লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভাগুলিতে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করা। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য লোকসভার আসন সংখ্যা বর্তমানের ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৮৫০ পর্যন্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বিশাল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ডিলিমিটেশন’ বা আসন পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এর ফলে সাধারণ আসন ও সংরক্ষিত আসনের ভারসাম্য রক্ষিত হবে।

সংবিধানের সংশোধনী ও নতুন কাঠামো

এই নতুন ব্যবস্থাকে আইনি বৈধতা দিতে ভারতের সংবিধানের আর্টিকেল ৮১ সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী লোকসভার নতুন বিন্যাস হবে নিম্নরূপ:

  • নতুন নিয়ম অনুযায়ী রাজ্যগুলির আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে সরাসরি নির্বাচিত হবেন সর্বোচ্চ ৮১৫ জন সদস্য।
  • কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য নির্ধারিত থাকবে সর্বোচ্চ ৩৫টি আসন।
  • সামগ্রিকভাবে লোকসভার মোট সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

জনগণনা ও ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া

স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, নতুন জনগণনার পরেই আসন পুনর্বিন্যাস হওয়ার কথা। তবে ২০৩১ সালের জনগণনার জন্য অপেক্ষা করলে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর করার স্বার্থে সরকার ২০১১ সালের জনগণনার তথ্যের ভিত্তিতেই ডিলিমিটেশন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া দিল্লি, জম্মু-কাশ্মীর এবং পুদুচেরির মতো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সক্ষমতামূলক বিল আনার প্রক্রিয়া চলছে।

সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তি

এই বিলটি কেবল উচ্চবিত্ত বা সাধারণ নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে না, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। বিলে তফসিলি জাতি (SC) এবং তফসিলি জনজাতির (ST) মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যেও ৩৩ শতাংশ ‘সাব-কোটা’ বা উপ-সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে সমাজের প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া স্তরের নারীরা সরাসরি জাতীয় ও রাজ্যস্তরের নীতিনির্ধারণীতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন, যা ভারতীয় রাজনীতির মূল স্রোতধারাকে আরও বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলবে।

এক ঝলকে

  • লক্ষ্য: লোকসভা ও বিধানসভায় নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ।
  • সাংবিধানিক পরিবর্তন: সংবিধানের আর্টিকেল ৮১ সংশোধনের প্রস্তাব।
  • আসনের নতুন বিন্যাস: লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৮৫০ পর্যন্ত করার পরিকল্পনা।
  • ডিলিমিটেশন ভিত্তি: ২০৩১ নয়, বরং ২০১১ সালের জনগণনার ওপর ভিত্তি করেই আসন পুনর্বিন্যাস।
  • অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি: তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ উপ-সংরক্ষণ।
  • এলাকাভিত্তিক প্রয়োগ: লোকসভার পাশাপাশি দিল্লি, জম্মু-কাশ্মীর ও পুদুচেরির বিধানসভাতেও সমান গুরুত্ব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *