সুজিত-দেবরাজের ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলরের রহস্যমৃত্যু! সুজিতের গ্রেফতারির পরই নাগেরবাজারে উদ্ধার সঞ্জয়ের ঝুলন্ত দেহ

বিধাননগরের কাউন্সিলর সম্রাট বড়ুয়া ওরফে রাখালের তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতারি এবং শিয়ালদহ রোজগার মেলায় ৫১ হাজার যুবকের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার মেগা খবরের মাঝেই, উত্তর ২৪ পরগনার রাজনৈতিক মহলে এক চরম ও হাড়হিম করা ঘটনার খবর সামনে এল। দক্ষিণ দমদম পৌরসভা এলাকায় এক হেভিওয়েট তৃণমূল কাউন্সিলরের রহস্যমৃত্যুকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়াল। দক্ষিণ দমদম পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের দাপুটে তৃণমূল কাউন্সিলর সঞ্জয় দাসের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে তাঁর নিজস্ব বাসভবন থেকে।
গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে তড়িঘড়ি নাগেরবাজারের আইএলএস (ILS) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। ধৃত প্রাক্তন দমকল মন্ত্রী সুজিত বসুর পাশাপাশি রাজারহাট-গোপালপুরের দাপুটে নেতা দেবরাজ চক্রবর্তীরও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন এই সঞ্জয়। এই আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নজিরবিহীন শোরগোল শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
তোলাবাজির নালিশ এবং সুজিতের গ্রেফতারির পর থেকেই অবসাদ
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নব্য সরকারের জমানায় বিগত কয়েকদিনে বিধাননগর ও দক্ষিণ দমদম পৌরসভা এলাকায় সিন্ডিকেট রাজ ও বেআইনি দখলদারির বিরুদ্ধে পুলিশ যেভাবে ‘দাবাং মুডে’ অ্যাকশন শুরু করেছে, তার পর থেকেই চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন সঞ্জয়।
পুলিশি তদন্তে উঠে আসা প্রাথমিক কিছু তথ্য:
- তোলাবাজির অভিযোগ: ধৃত কাউন্সিলর টিংকু ও সম্রাটের মতো ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সঞ্জয় দাসের বিরুদ্ধেও এলাকায় প্রোমোটারদের কাছ থেকে লাগাতার তোলাবাজি, হুমকি ও সিন্ডিকেট রাজ চালানোর একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়ছিল পুলিশের কাছে।
- গ্রেফতারির আতঙ্ক ও মানসিক অবসাদ: সুজিত বসুর অত্যন্ত ছায়াসঙ্গী তথা দক্ষিণ দমদমের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পার্থ ভার্মা ওরফে টিংকুর লেকটাউন থানার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন সঞ্জয়। পুলিশ যেকোনো মুহূর্তে তাঁর বাড়িতেও হানা দিতে পারে, এই চরম গ্রেফতারির আতঙ্ক ও মানসিক অবসাদ (Depression)-এর জেরে তিনি এই চরম পথ বেছে নিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
রহস্যমৃত্যুর তদন্তে নাগেরবাজার ও দমদম থানার পুলিশ
শনিবার সকালে কাউন্সিলরের ঘর থেকে তাঁর নিথর দেহ ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়ার পর গোটা এলাকা জুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পাওয়া মাত্রই দমদম ও নাগেরবাজার থানার পুলিশ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের (Post-Mortem) জন্য পাঠানো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন ভাটপাড়া-হালিশহরে তৃণমূলের পুরবোর্ড ভাঙন রুখতে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউন্সিলরদের ‘মাটি কামড়ে’ পড়ে থাকার কড়া নির্দেশ দিচ্ছেন এবং অন্যদিকে ভুয়ো কাস্ট সার্টিফিকেট রুখতে মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু কড়া দাওয়াই দিচ্ছেন— সেই উত্তাল রাজনৈতিক আবহে সুজিত-দেবরাজ শিবিরের এই প্রভাবশালী কাউন্সিলরের রহস্যমৃত্যু নজিরবিহীন ঘটনা। পুলিশের খাতায় নাম ওঠার আগেই কি গ্রেফতারির ভয়ে সঞ্জয় নিজেকে শেষ করে দিলেন, নাকি এর নেপথ্যে ইম্পা-র সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তের ওপর মানসিক চাপের মতো কোনো গভীর রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত রয়েছে, তা জানতে মৃতের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ অনুগামীদের জেরা করা শুরু করেছে পুলিশ।
