অভিষেকের ওপর হামলার পর উত্তাল বাংলা, অতীতে বিরোধী নেতাদের রক্তক্ষরণের খতিয়ান মনে করাচ্ছে বিজেপি-বামেরা – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
সোনারপুরে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার ঘটনায় এই মুহূর্তে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর। তৃণমূল সুপ্রিমো তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই হামলার জন্য সরাসরি বিজেপিকে নিশানা করেছেন। পাল্টা জবাবে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই হামলায় তাঁদের দল কোনোভাবেই জড়িত নয়। উল্টে তিনি এবং বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল জমানায় বিরোধীদের ওপর ঘটে যাওয়া একের পর এক রক্তক্ষয়ী হামলার ইতিহাস। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসক দলের নেতার ওপর হামলার ঘটনা যেমন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতিকে স্পষ্ট করে, তেমনই অতীতে বিরোধীদের ওপর হামলার পুনরাবৃত্তি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতিকেই দীর্ঘায়িত করছে, যা রাজ্যের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জেপি নাড্ডা থেকে শুভেন্দু, বারবার আক্রান্ত পদ্ম শিবির
তৃণমূল জমানায় বিরোধী নেতাদের ওপর হামলার খতিয়ান বেশ দীর্ঘ। ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর ডায়মন্ড হারবারে সভা করতে যাওয়ার পথে বিজেপির তৎকালীন সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডার কনভয়ে নজিরবিহীন হামলা চালানো হয়। কনভয় লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটবৃষ্টির জেরে বেশ কয়েকটি গাড়ির কাচ ভেঙে যায় এবং দিলীপ ঘোষের নিরাপত্তারক্ষী আহত হন। এই প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ স্পষ্ট ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “যখন নাড্ডার গাড়িতে পাথর মেরেছিল, আমি নিজে গাড়িতে ছিলাম। গাড়ি বুলেট প্রুফ ছিল, নাহলে সেদিন আমরা কেউ বাঁচতাম না। সেটা যদি জনরোষ হয়, তাহলে এটাও জনরোষ।”
এর আগে ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর পাহাড়ে আক্রান্ত হয়েছিলেন স্বয়ং দিলীপ ঘোষ। দার্জিলিং সদরে বিজেপির সভা চলাকালীন হামলা চালিয়ে মাইক কেড়ে নেওয়া হয় এবং থানায় অভিযোগ জানাতে যাওয়ার পথে দিলীপবাবুকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়। তাঁর আপ্ত সহায়ক ও যুব নেতাদের রাস্তায় ফেলে মারধরের অভিযোগও উঠেছিল।
আক্রান্ত হয়েছেন বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বও। ২০২৫ সালের ৫ অগস্ট কোচবিহারে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ে হামলা চালিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। শুভেন্দু অধিকারী সে সময় অভিযোগ করেছিলেন, তাঁকে প্রাণে মারার জন্যই ওই হামলা হয়েছিল। এমনকি চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি পুরুলিয়া থেকে ফেরার পথে চন্দ্রকোনা রোড বাজারের কাছে লাঠি ও বাঁশ নিয়ে তাঁর কনভয়ে পুনরায় হামলা চালানো হলে তিনি পুলিশ ফাঁড়িতে ধর্ণায় বসতে বাধ্য হন।
রক্তাক্ত হয়েছেন সাংসদ খগেন মুর্মু ও বাম নেতা ধীরেন লেট
হামলার হাত থেকে রেহাই পাননি মালদহ উত্তরের বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুও। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর নাগরাকাটায় বন্যা ও ধস কবলিত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে তিনি গুরুতর হামলার শিকার হন। হামলায় তাঁর মাথায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়, চোখের নিচের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ ঘটে। তাঁর সঙ্গে থাকা বিধায়ক শঙ্কর ঘোষও সেই দিন আক্রান্ত হয়েছিলেন।
কেবল বিজেপি নয়, ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর বীরভূমের ময়ূরেশ্বরে সিপিএমের মিছিলে হামলা চালিয়ে চারবারের বাম বিধায়ক ধীরেন লেটের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাঁশ দিয়ে। শুধু তাই নয়, কান ধরিয়ে তাঁকে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে বাধ্য করার মতো ন্যাক্কারজনক অভিযোগও উঠেছিল শাসক আশ্রিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে বিরোধীদের ওপর ঘটে যাওয়া এই সমস্ত হামলার ঘটনার জেরেই আজ শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকেও একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা রাজ্যে রাজনৈতিক হিংসার এক অন্তহীন চক্র তৈরি করছে।
