ইকবালের পর ৩ বোন! ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরে ভেসে কাটে জীবন, জিনের নাকি মানসিক ব্যাধি? চরম উৎকণ্ঠায় মা – এবেলা

ইকবালের পর ৩ বোন! ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরে ভেসে কাটে জীবন, জিনের নাকি মানসিক ব্যাধি? চরম উৎকণ্ঠায় মা – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

মুম্বইয়ের আলো পেলেন ইকবাল, কিন্তু নেপথ্যে হারিয়ে গেলেন তাঁর তিন জেঠতুতো বোন! একই বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরের জলে ভেসে কাটাচ্ছেন বেলডাঙার তৌফিকা, নাসরিন ও তানিয়া। চরম আর্থিক অনটন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় রাতে চোখের ঘুম উড়েছে তাঁদের মা গুলশন বেওয়ার।

বেলডাঙা (মুর্শিদাবাদ): সোশ্যাল মিডিয়ায় জল-ভাসা ভিডিও ভাইরাল হতেই চিকিৎসার জন্য মুম্বই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বেলডাঙার ফরাজিপাড়ার যুবক ইকবাল হোসেনকে। কিন্তু লাইমলাইটের আড়ালেই থেকে গিয়েছেন ইকবালের পরিবারের আরও তিন বোন। ইকবালের মতো তাঁর জেঠতুতো তিন দিদি-বোন তৌফিকা পারভিন (২২), নাসরিন সুলতানা (১৮) ও তানিয়া সুলতানা (১৬)— চরম শারীরিক জ্বালাপোড়ায় জলই তাঁদের একমাত্র আশ্রয়।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই গ্রামের পুকুরে নেমে পড়েন তিন বোন। অন্ধকার না নামা পর্যন্ত অনেক সময় জল থেকে ওঠেন না। শুধু তা-ই নয়, সারাদিন বরফ-ঠান্ডা জল খাওয়া ও অনবরত স্নানের কারণে তিনজনেই এখন তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। ঘনঘন বেলডাঙা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ইনজেকশন ও অক্সিজেন দিতে হয় তাঁদের।

চার বছর আগে মারা গিয়েছেন বাবা মুরসালিম শেখ। মা গুলশন বেওয়া এক বেসরকারি মাদ্রাসায় মাসিক মাত্র ৩ হাজার টাকায় পরিচারিকার কাজ করেন। ওই সামান্য আয় ও প্রতিবেশীদের সাহায্যেই কোনোমতে সংসার চলে। মা জানান, ১০-১২ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েরা স্বাভাবিকই ছিল। তারপর থেকেই ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে এবং বর্তমানে প্রত্যেকের ওজনই ১০০ কেজি ছাড়িয়েছে। অসুস্থতার কারণে কারও পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি, এমনকী বাড়ির দৈনন্দিন কাজ বা রান্নাও তাঁরা করতে পারেন না।

পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে, রাতের অন্ধকারেও শারীরিক অস্বস্তি কাটাতে মেয়েরা পুকুরের দিকে ছুটে যায়। সেই ভয়ে ঘরের বারান্দায় গ্রিল লাগিয়ে তালাবন্ধ করে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মা।

কিন্তু কেন এই অদ্ভুত অসুস্থতা? জিনের প্রভাব নাকি অন্য কিছু? পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের দাদু মুস্তাফা শেখ এবং বাবা-কাকাদেরও একটি বয়সের পর ওজন অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। তিনজনই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে অকালমৃত্যুর মুখে পড়েন।

  • চিকিৎসকদের বক্তব্য: মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ অনাদি রায়চৌধুরী জানান, “প্রাথমিকভাবে এটিকে বংশগত বা জিনগত রোগ বলে মনে হচ্ছে। তবে পরীক্ষা না করে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়। হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা হবে।”
  • মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মত: অন্যদিকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রঞ্জন ভট্টাচার্য জানান, অতিরিক্ত ওজনের কারণে এরা হয়তো ‘বডি শেমিং’-এর শিকার হয়ে মানসিক অবসাদে ভুগছেন, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার’ (Somatoform Disorder) বলা হয়। মানসিক কষ্ট থেকেই শরীরে এই তীব্র জ্বালা ভাব তৈরি হতে পারে, যা জল পেলে খানিক প্রশমিত হয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন জলে থাকার ফলে ত্বকের নানাবিধ রোগ (যেমন স্ক্যাবিস, ডার্মাটাইটিস) হওয়ার আশঙ্কাও প্রবল।

ইকবালের মতো মুম্বই না হলেও, বেলডাঙার এই তিন মেয়ের দিকে কি বাড়বে সরকারি বা কোনো স্বহৃদয় ব্যক্তির সাহায্যের হাত? এখন সেই আশাতেই দিন গুনছেন মা গুলশন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *