ইস্তফা না দিলেও কি ক্ষমতায় থাকা সম্ভব? নবান্নের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা বলছে ভারতের সংবিধান

ইস্তফা না দিলেও কি ক্ষমতায় থাকা সম্ভব? নবান্নের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা বলছে ভারতের সংবিধান

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট লুটের অভিযোগ তুলে এখনই ইস্তফা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরেও কি সত্যিই গদি আঁকড়ে থাকা সম্ভব? ভারতের সংবিধান ও সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী এই পরিস্থিতিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, তার একটি বিশ্লেষণাত্মক রিপোর্ট এখানে তুলে ধরা হল।

১. রাজ্যপালের হাতে বরখাস্ত করার ক্ষমতা

সংবিধানের ১৬৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের সন্তুষ্টি (Pleasure of the Governor) থাকা পর্যন্ত নিজের পদে বহাল থাকতে পারেন। যদি কোনো মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে পরাজিত হন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পরেও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করেন, তবে রাজ্যপাল তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিতে পারেন এবং তাতে রাজি না হলে তাঁকে সরাসরি বরখাস্ত করার ক্ষমতাও রাখেন রাজ্যপাল।

২. নতুন সরকার গঠন ও স্বয়ংক্রিয় বিলুপ্তি

সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম বলছে, ভোটের ফল ঘোষণার পর রাজ্যপাল বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের নেতাকে সরকার গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। এক্ষেত্রে ২০৭টি আসন পাওয়া বিজেপির পরিষদীয় দলনেতাকে সরকার গড়ার আহ্বান জানানো হবে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করার মুহূর্তেই পুরনো মন্ত্রিসভা এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। ফলে পুরনো মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা না দিলেও আইনত তাঁর আর কোনো ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে না।

৩. রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা

যদি মুখ্যমন্ত্রী পরাজিত হওয়ার পরেও গদি ছাড়তে অস্বীকার করেন এবং রাজ্যে সাংবিধানিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে রাজ্যপাল পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কেন্দ্রে ‘রাষ্ট্রপতি শাসন’ (Article 356) জারির সুপারিশ করতে পারেন। এছাড়া, সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো কোনো নেতার প্রশাসনিক বৈধতা থাকে না। এমতাবস্থায় রাজ্যপাল সচিবালয় বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিতে পারেন যেন তাঁরা বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর কোনো নতুন আদেশ পালন না করেন।

৪. কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা

সাধারণত সৌজন্যের খাতিরে ভোটের ফল প্রকাশের পর পুরনো মুখ্যমন্ত্রীকে ‘কেয়ারটেকার’ বা তত্ত্বাবধায়ক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হয়। এটি করা হয় কেবল প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য, যতক্ষণ না নতুন সরকার শপথ নিচ্ছে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি ইস্তফা দিতে অস্বীকার করেন, তবে ৭ মে-র মধ্যে তাঁর পদের কার্যকারিতা আইনত ‘ফ্রিজ’ বা স্থগিত হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হবে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনড় মনোভাব শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পথে হাঁটলে বিষয়টি দেশের উচ্চ আদালতেও পৌঁছাতে পারে। তবে সাংবিধানিক রীতিনীতি অনুযায়ী, জনগণের রায় ও সংখ্যার পাল্লাই শেষ পর্যন্ত নবান্নের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

প্রতিবেদক: বর্তমান ঠাকুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *