কোনো চাপেই মাথানত নয়, পুর-নেতাদের বার্তা মমতার – এবেলা

কোনো চাপেই মাথানত নয়, পুর-নেতাদের বার্তা মমতার – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের ভাটপাড়া, গারুলিয়া, নৈহাটি, হালিশহর এবং কাঁচরাপাড়া পৌরসভার তৃণমূল কাউন্সিলরদের মধ্যে যখন গণইস্তফার হিড়িক লেগেছে, ঠিক সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে কলকাতা পৌরসভার (KMC) দলীয় কাউন্সিলরদের ডেকে ‘ভোকাল টনিক’ দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার বিকেলে কালীঘাটে নিজের বাসভবন সংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ে কলকাতা পৌরসভার কাউন্সিলরদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠক করেন তিনি। সেখানে পুর প্রতিনিধিদের স্পষ্ট ভাষায় বার্তা দিয়ে মমতা বলেন, “কাউন্সিলররা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাই কোনো চাপের মুখে পদ ছাড়বেন না। সাধারণ মানুষকে পরিষেবা দিয়ে যান এবং মাটি কামড়ে পড়ে থেকে লড়াই করুন।”

পুরসভাগুলোতে অস্থিরতা ও কালীঘাটের বৈঠক

বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছিল যে, এবার কি রাজ্যের পৌরসভাগুলোতেও গেরুয়া ঝড় উঠতে চলেছে? ঘটনাচক্রে দেখা গেছে, নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূলের দখলে থাকা বহু পৌরসভার কাউন্সিলররা জনপরিষেবামূলক কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছেন, অনেকেই পৌরসভায় যাচ্ছেন না বা দল থেকে দূরত্ব তৈরি করছেন। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে ইতিমধ্যেই একের পর এক কাউন্সিলর ইস্তফা দেওয়ায় ঘাসফুল শিবিরের বোর্ডগুলো ভাঙনের মুখে পড়েছে।

এমনকি কলকাতা পৌরসভাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। শুক্রবার মূল অধিবেশন কক্ষ ‘বন্ধ’ থাকায় বাধ্য হয়ে তৃণমূল কাউন্সিলরদের ক্লাব রুমে বসে বিকল্প বৈঠক করতে হয়েছে। এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটেই কলকাতার ১৩৭ জন কাউন্সিলরের মধ্যে প্রায় ১১০ জনকে নিয়ে বৈঠকে বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও প্রায় ২৫ জন পুর প্রতিনিধিকে অনুপস্থিত থাকতে দেখা গেছে, যা নিয়ে দলের অন্দরে গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

ডিসেম্বর পর্যন্ত মাটি কামড়ে লড়াইয়ের নির্দেশ

বৈঠকে কাউন্সিলরদের আশ্বস্ত ও চাঙ্গা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কাউন্সিলররা জনপরিষেবার ক্ষেত্রে প্রতিদিন যথেষ্ট গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তাই কেউ ভয় পাবেন না। নিজের কাজ চালিয়ে যান। মেয়র, মেয়র পারিষদ কিংবা কাউন্সিলর— কেউ পদ ছাড়বেন না। আপনারা পদ ছাড়লেই বিজেপি পৌরসভা দখল করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত কলকাতা পৌরসভার মেয়াদ আছে। ফলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মানুষের জন্য কাজ করে যান।”

ডোরিনা ক্রসিংয়ে আন্দোলন ও আইনি লড়াই

কলকাতা পৌরসভার অধিবেশন কক্ষ যেভাবে বন্ধ করে রাখা হয়েছে, তাকে ‘বিজেপির গা-জোয়ারি’ আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে আইনি পথে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। একই সাথে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “প্রয়োজনে ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিং বা শহরের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জোরালো প্রতিবাদ কর্মসূচি করুন। পুলিশ কোথাও অনুমতি না দিলে কলকাতা পৌরসভার ভেতরেই ধরনা ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চালান।” পাশাপাশি মানুষের সাথে জনসংযোগ বাড়ানোর এবং পুরপরিষেবা সচল রাখার সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন কাউন্সিলরদের বেঁধে দেন তিনি।

অভিষেকের বাড়ি ভাঙার নোটিস প্রসঙ্গে ক্ষোভ

এদিনের বৈঠকে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি সংক্রান্ত পৌরসভার নোটিসের বিষয়টিও বিশদে উঠে আসে। এই বিষয়ে বিজেপির ‘বুলডোজার নীতি’কে আক্রমণ করে মমতা বলেন, “হঠাৎ করে নোটিস দিয়েই তো আর কারও বাড়ি ভেঙে দেওয়া যায় না! আইন মোতাবেক এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনেই তো কাজ করতে হবে।” পরে এই প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানান, “আমার বাড়ির কোন অংশটির নির্মাণ অবৈধ, সেটা পৌরসভা আগে সঠিক মাপ নিয়ে লিখিতভাবে জানাক। তারপর এই বিষয়ে আইনি উত্তর দেব।”

এক ঝলকে

  • ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের একাধিক পৌরসভায় তৃণমূল কাউন্সিলরদের ইস্তফার মাঝেই কলকাতা পৌরসভার কাউন্সিলরদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত কাউন্সিলরদের ‘মাটি কামড়ে’ থেকে কাজ করার নির্দেশ দলনেত্রীর।
  • পুরসভার অধিবেশন কক্ষ বন্ধ রাখার প্রতিবাদে মেয়র ফিরহাদ হাকিমের নেতৃত্বে ডোরিনা ক্রসিং বা পুরভবনের ভেতরেই আন্দোলনের ডাক।
  • অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ভাঙার নোটিসের বিরোধিতা করে আইনি প্রক্রিয়া মেনে কাজ করার বার্তা মমতা ও অভিষেকের।
  • কলকাতার ১৩৭ জন কাউন্সিলরের মধ্যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ১১০ জন, অনুপস্থিত ২৫ জনকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *