গঙ্গাজল কেন বছরের পর বছর পচে না? জেনে নিন নেপথ্যের বৈজ্ঞানিক রহস্য – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
September 8, 202610:33 am
সাধারণ কলের জল বা পুকুরের জল বোতলে রাখলে দু-এক দিনেই দুর্গন্ধ বের হয় কিংবা শ্যাওলা পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। অথচ বছরের পর বছর বোতলবন্দি রাখা সত্ত্বেও গঙ্গাজল একই রকম বিশুদ্ধ থাকে। ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে গঙ্গাজলকে পবিত্র ও ‘অমৃত’ মনে করা হলেও, এর দীর্ঘস্থায়ী বিশুদ্ধতার পিছনে কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং রয়েছে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ।
রোগজীবাণু ধ্বংসকারী ‘বান্ধব ভাইরাস’ ১৮৯০-এর দশকে প্রয়াগরাজের মাঘ মেলায় ভয়াবহ কলেরা মহামারী দেখা দেয়। সে সময় গঙ্গায় প্রচুর মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও যারা গঙ্গার জল পান ও ব্যবহার করেছিলেন, তাদের অনেকেই নিরাপদ ছিলেন। ১৮৯৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আর্নেস্ট হ্যাঙ্কিন গবেষণা করে জানান, কুয়োর জলে কলেরার মারণ জীবাণু (Vibrio cholerae) দ্রুত বংশবৃদ্ধি করলেও গঙ্গাজলে ফেলে দিলে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে তা ধ্বংস হয়ে যায়।
পরবর্তীকালে ফরাসি বিজ্ঞানী ফেলিক্স ডেল ডেরেল আবিষ্কার করেন এক বিশেষ ধরনের জীবাণু, যা মানুষের কোনো ক্ষতি না করে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ভক্ষণ করে ফেলে। তিনি এর নাম দেন ‘ব্যাকটেরিওফেজ’ (Bacteriophage)। গবেষণায় দেখা গেছে, গঙ্গাজলে প্রায় ১,০০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিওফেজ রয়েছে।
গঙ্গাজলের বিশুদ্ধতা বজায় থাকার ৩টি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ:
- ব্যাকটেরিওফেজের সক্রিয়তা: গঙ্গার জলে থাকা ব্যাকটেরিওফেজ জলকে পচিয়ে দেওয়া ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে খেয়ে ফেলে। ফলে জল দুর্গন্ধযুক্ত বা নষ্ট হতে পারে না।
- অতিরিক্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন (Dissolved Oxygen): হিমালয় থেকে প্রবাহিত হয়ে আসার সময় বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ ও খনিজের সংস্পর্শে এসে গঙ্গাজলে অক্সিজেনের পরিমাণ সাধারণ জলের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। জল বেশি অক্সিজেন ধরে রাখতে পারে বলে পচন সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় না।
- সালফার ও প্রাকৃতিক খনিজ: গঙ্গোত্রী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত যাত্রাপথে গঙ্গার জল সালফার সমৃদ্ধ শিলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সালফার প্রাকৃতিকভাবেই জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া জ্যান্থোমোনাস ও সিউডোমোনাসের মতো উপকারী ব্যাকটেরিয়াও জলকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিশুদ্ধ রাখে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও দূষণের প্রভাব প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে গঙ্গাজল পচে না ঠিকই, তবে কলকারখানার বর্জ্য ও অনিয়ন্ত্রিত দূষণের ফলে গঙ্গার সমতল বা নিম্নাঞ্চলের (যেমন কলকাতা ও তার আশপাশের এলাকা) জলে এই গুণমান অনেকটাই কমে গেছে। বিজ্ঞানীরা জানান, বর্তমানে মূলত গঙ্গোত্রী বা হরিদ্বারের মতো পার্বত্য এলাকার গঙ্গার জলই এই প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা সবচেয়ে বেশি বজায় রাখতে সক্ষম।
