ডায়মন্ড হারবারের পর এবার হুগলি, ভদ্রেশ্বরে চেয়ারম্যানসহ ৮ তৃণমূল কাউন্সিলরের গণ-ইস্তফা – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
ডায়মন্ড হারবারের পর এবার বড়সড় ধস নামল হুগলির ভদ্রেশ্বর পুরসভায়। চন্দননগর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই পুরসভার চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তীসহ মোট আট জন তৃণমূল কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন। বৃহস্পতিবার ভদ্রেশ্বর পুরসভার এগ্জিকিউটিভ অফিসারের কাছে নিজের ইস্তফাপত্র জমা দেন চেয়ারম্যান। সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে এলাকায় দলের ভরাডুবির নৈতিক দায় স্বীকার করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। ভোটের ফলপ্রকাশের পর হুগলি জেলায় এই প্রথম কোনো পুরবোর্ডে একসঙ্গে এত জন জনপ্রতিনিধি পদ ছাড়লেন।
‘বিরোধীশূন্য’ পুরসভাতেও বিপর্যয়
ভদ্রেশ্বর পুরসভার রাজনৈতিক সমীকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চন্দননগর বিধানসভার অধীনস্থ এই পুরসভায় মোট ২২টি ওয়ার্ড রয়েছে। বিগত পুর নির্বাচনে ২০টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। বাকি দুটি আসনের একটিতে বিজেপি এবং অন্যটিতে নির্দল প্রার্থী জয়ী হলেও, পরবর্তীতে তাঁরা দুজনেই ঘাসফুল শিবিরে যোগ দেন। ফলে পুরসভাটি কার্যত বিরোধীশূন্য হয়ে পড়েছিল। তবে সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে এই চেনা দুর্গেও বড়সড় ধাক্কা খায় শাসকদল। ২২টি ওয়ার্ডের মধ্যে প্রায় ১৪টি ওয়ার্ডেই পিছিয়ে ছিল তৃণমূল। চন্দননগর বিধানসভা কেন্দ্রে দলের হেভিওয়েট প্রার্থী ইন্দ্রনীল সেন মোট ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত হন। এই বিপর্যয়ের দায় কাঁধে নিয়েই পদত্যাগ করেন প্রলয়বাবু। পরবর্তীতে জানা যায় যে, তাঁর দেখাদেখি আরও বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরও ইস্তফা দিয়েছেন।
ইস্তফার কারণ ও রাজনৈতিক তরজা
চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তী জনমত ও নৈতিকতার কথা বললেও, এই গণ-ইস্তফার নেপথ্যে অন্য একাধিক তত্ত্ব নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। তৃণমূলের অন্দরের দাবি, রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর পুরসভাগুলিতে সরকারি অনুদান বা ফান্ড পেতে সমস্যা হচ্ছিল। এই আর্থিক সঙ্কটের জেরে কাউন্সিলরদের পক্ষে সাধারণ পুরপরিষেবা ও উন্নয়নমূলক কাজ চালানো কার্যত আসাম্ভব হয়ে পড়েছিল। অন্য দিকে, বিজেপির একাংশের দাবি, রাজ্য জুড়ে চলা পুরসভাগুলির নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে এবার নাম জড়াতে পারে, এই আশঙ্কায় ও আইনি কোপ থেকে বাঁচতেই তড়িঘড়ি পদ ছাড়ছেন এই কাউন্সিলরেরা। যদিও নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ উড়িয়ে প্রলয় চক্রবর্তীর সাফাই, যা নিয়োগ হয়েছিল তা আগের চেয়ারম্যানের আমলে হয়েছে।
ইস্তফা দেওয়ার পর প্রলয় চক্রবর্তী সাংবাদিকদের জানান, তিনি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে ইস্তফা দিয়েছেন। দল কিংবা চন্দননগরের বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহর তরফ থেকে কোনো চাপ ছিল না। তবে এই ইস্তফাকে কটাক্ষ করে চন্দননগরের বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ বলেন, “ওদের অন্তরাত্মা জেগে উঠেছে। এত দিন ওরা দুষ্টু লোকেদের সঙ্গে ছিলেন। মানুষ পরিষেবা পাচ্ছিল না।” অন্য দিকে, বিভিন্ন পুরসভায় বেনিয়মের যে সব অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট পুরসভাগুলিতে দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।
পুরবোর্ডের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য প্রভাব
একসঙ্গে আট জন কাউন্সিলর পদত্যাগ করলেও ভদ্রেশ্বর পুরবোর্ড চালাতে এখনই কোনো আইনি বা প্রশাসনিক সমস্যা হবে না বলে জানা গিয়েছে। তৃণমূল সূত্রের খবর, আপাতত ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ খানের নেতৃত্বেই সচল থাকবে এই পুরবোর্ড। তবে ভদ্রেশ্বরের এই ঘটনা রাজনৈতিকভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার পুরসভার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে। সেখানেও একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে আট জন তৃণমূল কাউন্সিলর ইস্তফা দিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই গণ-ইস্তফার জেরে আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে শাসকদলের সাংগঠনিক শক্তি যেমন ধাক্কা খাবে, তেমনই পুরপরিষেবা স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রেও তৈরি হতে পারে সাময়িক জটিলতা।
