তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসাল বাম-কংগ্রেস, নীল-সাদা আকাশে সিঁদুরে মেঘ!

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের চুলচেরা বিশ্লেষণ বলছে, তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের ‘নিশ্চিন্ত’ ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত সংখ্যালঘু ভোটে বড়সড় ধস নেমেছে। রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে যা এক নতুন মোড়। বিশেষত মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং বীরভূমের মতো জেলাগুলিতে ঘাসফুলের একচেটিয়া আধিপত্যে ভাগ বসিয়েছে বাম-কংগ্রেস জোট ও আইএসএফ। মুসলিম অধ্যুষিত আসনগুলিতে শাসকদলের এই রক্তক্ষরণ রাজ্যের রাজনৈতিক আকাশে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মুর্শিদাবাদ ও মালদহে ওলটপালট সমীকরণ
রাজ্যের প্রায় ৮৫টি আসনে মুসলিম জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশের বেশি, যা বরাবরই তৃণমূলের জয়ের মূল চাবিকাঠি ছিল। তবে এবারের চিত্রটা ভিন্ন। মুর্শিদাবাদের ২২টি আসনের মধ্যে ১৭টি মুসলিম-প্রধান হলেও সেখানে ডোমকল বা রানিনগরের মতো জায়গায় বাম ও কংগ্রেস প্রার্থীরা জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন। ডোমকলে সিপিএমের মোস্তাফিজুর রহমান বা রানিনগরে কংগ্রেসের জুলফিকার আলির জয়ের নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের পকেট থেকে সংখ্যালঘু ভোটের সরে আসা। এছাড়া হুমায়ুন কবীরের মতো নির্দল বা ছোট দলের প্রার্থীদের ভোট কাটাকাটিও শাসকদলের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। মালদহতেও ইভিএমের মেরুকরণ এবং গনি খান চৌধুরীর পরিবারের প্রতি সংখ্যালঘু আবেগের প্রত্যাবর্তন তৃণমূলের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোটের মেরুকরণ ও বাম-কংগ্রেসের উত্থান
বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটের এই বিভাজন সরাসরি সুবিধা করে দিচ্ছে বিজেপিকে। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর জয়ের ব্যবধান বৃদ্ধি কিংবা বীরভূমের ১১টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪টিতে তৃণমূলের জয়ী হওয়া প্রমাণ করে যে, বাম ও কংগ্রেস নিজেদের হারানো জমি কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে। নদিয়ার করিমপুর বা উত্তর দিনাজপুরের সীমান্ত এলাকাগুলিতেও দেখা গেছে, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক আর আগের মতো সংহত নেই; তা বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফ-এর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রভাব ও পরিণাম
এই ভোট কাটাকাটির ফলে অনেক আসনেই হিন্দু ভোট এককাট্টা হওয়ার সুযোগ পেয়েছে পদ্ম শিবির। অন্যদিকে, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া, বিশেষত সংখ্যালঘু প্রধান এলাকায়, তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করেছে। শাসকদলের এই ভরসার জায়গায় ফাটল ধরার অর্থ হলো—আগামী দিনে বিধানসভার পাটিগণিতে বাম-কংগ্রেস জোট আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। তৃণমূলের জন্য এই ফলাফল এক সতর্কবার্তা যে, কেবল উন্নয়ন নয়, ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে গেলে রাজনৈতিক কৌশলেও বড়সড় বদল আনা প্রয়োজন। অন্যথায়, ‘রাম-বামে’র এই পিঠেভাগের অঙ্কে ঘাসফুলের বাগান আরও তছনছ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
