ধর্মীয় ছুৎমার্গ ঝেড়ে এবার পুজো-মন্দির-মসজিদ কমিটিতে বামেরা

ধর্মীয় ছুৎমার্গ ঝেড়ে এবার পুজো-মন্দির-মসজিদ কমিটিতে বামেরা

রাজ্যে ঐতিহাসিক ক্ষমতা বদল ও বামেদের টানা নির্বাচনী ভরাডুবির পর অবশেষে ঘোর বাস্তবকে মেনে নিয়ে নিজেদের চিরাচরিত নীতিতে এক যুগান্তকারী ও বড়সড় বদল আনতে চলেছে সিপিআইএম (CPIM)। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে আয়োজিত দলের রাজ্য কমিটির ম্যারাথন বৈঠকে কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে উঠে এলো এক চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্ত। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং আমজনতার থেকে দলের দূরত্ব ঘোচাতে এবার থেকে কট্টর নাস্তিকতা বা ধর্মীয় ছুৎমার্গ সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলার বার্তা দেওয়া হয়েছে কমরেডদের। এখন থেকে দলের নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব, পুজো কমিটি কিংবা মসজিদ-মন্দিরের পরিচালন কমিটিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার বা সম্পৃক্ত হওয়ার সরাসরি নির্দেশ দিল সিপিএম নেতৃত্ব।

মানুষের ধর্মাচরণকে মর্যাদা দিতে হবে: এম এ বেবি

বামপন্থীদের এই ‘লাইন’ পরিবর্তনের বিষয়ে দলের পলিটব্যুরো সদস্য তথা প্রবীণ সিপিএম নেতা এম এ বেবি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। রাজ্য কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট করে দেন, দল কোনোদিনও সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে আপস করবে না, তবে তার মানে এই নয় যে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে আঘাত করা হবে। তিনি বলেন:

“আমরা সমস্ত রকম সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করি এবং তা জারি থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের নিজস্ব ধর্মীয় আবেগ ও ধর্মাচরণ রয়েছে। বামপন্থী কর্মীদের মানুষের সেই ধর্মাচরণকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে হবে। মানুষ যেখানে থাকে, যেখানে উৎসব করে, আমাদের কর্মীরা যদি সেখানে না পৌঁছান, তবে মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হবে কীভাবে?”

পুজো ও সামাজিক উৎসবে সরাসরি অংশগ্রহণের বার্তা

এর আগে বাংলায় বাম জমানায় বা তার পরবর্তী সময়েও পুজো মণ্ডপের বাইরে শুধু ‘মার্ক্সবাদী বুক স্টল’ বা বইয়ের দোকান দেওয়ার মধ্যেই বামেদের অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ থাকত। দলের কোনো সক্রিয় কর্মী বা নেতা পুজো কমিটির কর্মকর্তা হলে বা ধর্মীয় আচারে অংশ নিলে তা দলের শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু নতুন নির্দেশিকায় সেই কড়া অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে জানানো হয়েছে:

  • এলাকার দুর্গাপুজো, কালীপুজো বা ইদ-মহরমের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের কমিটিতে বাম কর্মীদের থাকতে হবে।
  • স্থানীয় মন্দির বা মসজিদের পরিচালন কমিটিতে জায়গা করে নিতে হবে, যাতে আরএসএস বা অন্য কোনো দক্ষিণপন্থী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি সেই সমস্ত জায়গাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।

ISF ও SDPI জোট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন

ধর্মীয় ছুৎমার্গ ভাঙার এই বড় সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে দলীয় রণকৌশল নিয়ে রাজ্য কমিটির বৈঠকে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন একাংশের সদস্যেরা। বিশেষ করে নির্বাচনে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF) এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া (SDPI)-র মতো দলের সঙ্গে অঘোষিত ও কৌশলগত সমঝোতা করা নিয়ে দলের অন্দরেই বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।

বৈঠকে একাংশের ক্ষুব্ধ নেতার দাবি, এই ধরণের সংখ্যালঘু তোষণ বা ধর্মীয় তকমা সাঁটা দলগুলির সঙ্গে সমঝোতা করার ফলে বামেদের চিরাচরিত ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি আমজনতার কাছে মারাত্মকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। যার খেসারত দিতে হয়েছে ইভিএম বক্সে। এই আত্মঘাতী জোটের সিদ্ধান্ত দলের জন্য কতটা মর্যাদাকর ছিল, তা নিয়ে রাজ্য কমিটিতে পলিটব্যুরোর উপস্থিতিতেই ব্যাপক চাপানউতোর তৈরি হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, আদর্শের খাঁচায় বন্দি থেকে বাংলায় বামেরা যেভাবে সাইনবোর্ডে পরিণত হচ্ছিল, তা থেকে বাঁচতেই এবার বাধ্য হয়ে ‘জনগণের লাইনে’ ফেরার এই মরিয়া চেষ্টা শুরু করল আলিমুদ্দিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *