নেপালে প্রলয়ঙ্করী হড়পা বান: মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, দেবঘাটে তৈরি হচ্ছে গণকবর; নিখোঁজ বাংলার বহু পর্যটক – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নেপাল ও চিন সীমান্তবর্তী রাসুয়া ও সংলগ্ন এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বান এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষত দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। রবিবার রাত পর্যন্ত সরকারি হিসেব অনুযায়ী মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৯৭-এ। বিপর্যয়ের পর চার দিন কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার মানুষ। এর মধ্যে অন্তত ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যার মধ্যে বাংলা থেকে একটি ভ্রমণ সংস্থার মাধ্যমে নেপালে যাওয়া ৩৭ জন পর্যটক ও ম্যানেজারও অন্তর্ভুক্ত।
দেবঘাটে গণকবর ও শনাক্তকরণের সংকট
মৃতদেহের সংখ্যা হু হু করে বাড়ায় এবং হাসপাতাল ও মর্গগুলির ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছে প্রশাসন। দেহ পচে দুর্গন্ধ ছড়ানো এবং মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে চিতওয়ান জেলার ভরতপুরের দেবঘাট জঙ্গলে জোরকদমে শুরু হয়েছে গণকবর তৈরির কাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছ’ফুট লম্বা ও তিন ফুট চওড়া এবং দেড় মিটার গভীর গর্ত খুঁড়ে শ’য়ে শ’য়ে কবর তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি কবরের মাঝে অন্তত ৪০ সেন্টিমিটার ফাঁক রাখা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে দেহ শনাক্ত করা গেলে তা সহজেই পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া যায়। প্রতিটি মরদেহের সঙ্গে জিওট্যাগিং এবং ইউনিক রেফারেন্স নম্বর যুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই মৃতদেহ শনাক্তকরণে নেপালকে সহায়তার জন্য গুজরাটের গান্ধীনগরের ন্যাশনাল ফরেন্সিক সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি থেকে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ ফরেন্সিক দল ইতিমধ্যেই নেপালে পৌঁছেছে।
উদ্ধারকাজে চরম বাধা ও চপার পাইলটের অভিজ্ঞতা
স্থলপথ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর একমাত্র ভরসা এখন হেলিকপ্টার। ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রকাশিত এক উদ্ধারকারী চপার-পাইলট বিবেক খাগড়ার ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এক মর্মান্তিক দৃশ্য। ত্রিশূলী নদীর জল এখনও ফুঁসছে এবং যত্রতত্র ধ্বংসস্তূপের মাঝে জলে ভাসছে একের পর এক মৃতদেহ। পাইলটের মতে, এমন বহু এলাকা রয়েছে যেখানে উদ্ধারকারী দল এখনও পৌঁছতেই পারেনি। মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য প্রচুর প্লাস্টিক শিট, পিপিই কিট ও বিশেষ ব্যাগের প্রয়োজন হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে শত শত শ্রমিক
উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ত্রিশূলী নদীর উপরে থাকা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকরা। রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলায় এমন ৯টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি নির্মীয়মাণ। সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে টন টন কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপ জমে থাকায় থার্মাল ড্রোনেও কিছু শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। রবিবার ড্রিল মেশিন ও হাইড্রোলিক কাটারের সাহায্যে নুয়াকোটের আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গের মুখ খুঁজে পেলেও ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের (যাদের সংখ্যা প্রায় ৫০০ হতে পারে) কাউকেই জীবিত অবস্থায় সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।
নেপালি সেনা এবং চিনের উদ্ধারকারী দলের যৌথ প্রয়াসে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চললেও প্রতিকূল পরিস্থিতি ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির জেরে নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা দিন দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছে।
