পারস্য উপসাগরে ট্রাম্পের রণহুঙ্কার ও ইরানের পাল্টা মরণফাঁদ ঘিরে ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের মেঘ

পারস্য উপসাগরের নিয়ন্ত্রণ এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মুখোমুখি অবস্থানে বিশ্ব রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করেছে। শান্তি আলোচনার টেবিলে কোনো সমাধান না মেলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কড়া সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের পথে হাঁটছেন।
মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ ও ট্রাম্পের কড়া অবস্থান
বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন নৌবাহিনীকে হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট—এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যেন কোনো জাহাজ যাতায়াত করতে না পারে। ট্রাম্প কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ইরান যদি আমেরিকার কথা না মানে, তবে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানকে ‘পাথর যুগে’ পাঠিয়ে দিতে আমেরিকার আধবেলা সময়ও লাগবে না।
পাল্টা মরণফাঁদ ও ইরানের হুঁশিয়ারি
আমেরিকার এই আগ্রাসী মনোভাবের জবাবে ইরানও পিছু হটতে নারাজ। দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী রিভোলিউশনারি গার্ডস সোশ্যাল মিডিয়ায় পার্সি ভাষায় এক বার্তায় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর জলপথ এখন সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে। তারা স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, শত্রুপক্ষ যদি সামান্যতম ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে তাদের জন্য পাতা ‘মরণফাঁদে’ পড়তে হবে।
বিবাদের নেপথ্যে জলপথের কর্তৃত্ব ও পরমাণু ইস্যু
এই সংঘাতের মূলে রয়েছে জলপথের কর্তৃত্ব এবং জাহাজ থেকে কর বা টোল আদায়ের দাবি। ইরান চায় এই প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলো তাদের টোল দিক। কিন্তু ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছেন, যারা ইরানকে অর্থ দেবে, তারা সমুদ্রে কোনো নিরাপত্তা পাবে না। অন্যদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরান যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না, তার জোরালো প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমেরিকা পিছু হটবে না।
চীনকে হুঁশিয়ারি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা
এই সংকটে ট্রাম্প পরোক্ষভাবে চীনকেও টেনে এনেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, চীন যদি ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করে, তবে চীনা পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ আমদানি কর চাপানো হবে। এদিকে লেবাননে ইজরায়েলি হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লেবানন প্রশাসনের তথ্যমতে, যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিশু ও স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। এই আঞ্চলিক অস্থিরতা পারস্য উপসাগরের উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
প্রভাব ও বিশ্ব পরিস্থিতি
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ পথ। এই পথে অবরোধ বা যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারে ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের এই অনমনীয় মনোভাব বিশ্বকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এক ঝলকে
• ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধের সম্ভাবনা তীব্র হয়েছে।
• হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনীকে অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
• শত্রুপক্ষকে ‘মরণফাঁদে’ ফেলার পাল্টা হুমকি দিয়েছে ইরানের রিভোলিউশনারি গার্ডস।
• ইরানকে অস্ত্র দিলে চীনা পণ্যে ৫০ শতাংশ আমদানিশুল্ক বসানোর হুঁশিয়ারি আমেরিকার।
• বিবাদের মূলে রয়েছে পরমাণু কর্মসূচি, জলপথের কর্তৃত্ব ও জাহাজ থেকে টোল আদায়।
• লেবানন ও ইজরায়েল সংঘর্ষের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।
