পুকুরেই কাটত দিনরাত, এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে চিকিৎসার জন্য মুম্বই পাড়ি বেলডাঙার ইকবালের – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
শরীরে অসহ্য জ্বালাপোড়া, আর তা সহ্য করতে না পেরে দিনরাত কেটে যেত পুকুরের জলের বুকেই। খাওয়া থেকে ঘুম—সবই জলে ভেসে ভেসে। সম্প্রতি নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সেই করুণ দৃশ্য নাড়িয়ে দিয়েছিল বহু মানুষের মন। শেষমেশ সেই ভাইরাল ভিডিয়োর সূত্র ধরেই বদলে গেল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার কিশোর ইকবাল হোসেনের জীবনের মোড়। এক বহুজাতিক সংস্থার পূর্ণ সহায়তায় মুম্বইয়ের একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে পাড়ি দিলেন ১২০ কেজি ওজনের এই কিশোর। শনিবার সকালে বেলডাঙা থেকে রওনা দেওয়ার সময় আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইকবাল।
অদ্ভুত ব্যাধি ও পুকুরের জল: বেলডাঙা থানার বড়ুয়া ফরাজিপাড়ার সাধারণ এক পরিবারের সন্তান ইকবাল। পরিবার সূত্রের খবর, দীর্ঘদিন ধরে এক অদ্ভুত ও জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত তিনি। সারা শরীরে প্রচণ্ড জ্বালা অনুভব করায় তা থেকে রেহাই পেতে পুকুরের ঠান্ডা জলকেই আশ্রয় করেছিলেন তিনি। রাতেও জলে ভেসে ঘুমোতেন। স্থানীয় বাসিন্দারা মায়াবশত পুকুরের জলে মুড়ি, কেক বা বিস্কুট ছুড়ে দিতেন, আর জলে দাঁড়িয়েই তা মুখে চালান করতেন ইকবাল। তবে টানা জলে ডুবে থাকার ফলে তাঁর হাত-পায়ের চামড়া সাদা হয়ে যায়, শরীরে দেখা দেয় চর্মরোগ (এগজ়িমা) ও লাগাতার সর্দি-কাশি।
সোশ্যাল মিডিয়ার জোর ও বহুজাতিক সংস্থার হাত: ইকবালের এই কষ্টের কথা প্রথম প্রকাশ্যে আনেন স্থানীয় বাসিন্দা কবীর আলি। তাঁর পোস্ট করা ভিডিয়োটি মুহূর্তের মধ্যে নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। স্থানীয় মুস্তাক আহমেদও সাহায্যের হাত বাড়ান। ভিডিয়োটি দেখার পরেই ইকবালের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি বহুজাতিক সংস্থা। তারা কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসককে পাঠায় ইকবালের শারীরিক অবস্থা খতিয়ে দেখতে। চিকিৎসকের রিপোর্টের ভিত্তিতে সংস্থাটি ইকবালকে মুম্বই নিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা, যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার সমস্ত দায়ভার গ্রহণ করে।
এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে যাত্রা: শনিবার সকালে একটি অ্যাম্বুল্যান্স ও একটি গাড়িতে করে ইকবাল এবং তাঁর পরিবারকে নিয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়। কলকাতা বিমানবন্দর থেকে বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে ইকবাল ও তাঁর মা কামিরন বিবি চিকিৎসকদের সঙ্গে মুম্বইয়ের উদ্দেশ্যে উদে যান। পাশাপাশি, অন্য একটি বিমানে ইকবালের সঙ্গী হিসেবে রওনা দেন তাঁর জামাই অপু শেখ এবং পরিযায়ী শ্রমিক রুবেল শেখ।
অভিমানের সুর সাহায্যকারীদের গলায়: ইকবালের চিকিৎসার ব্যবস্থা হওয়ায় পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের হাওয়া থাকলেও, কিছুটা আক্ষেপ ও অভিমানের সুর দেখা গেছে প্রাথমিক সাহায্যকারী কবীর আলি ও মুস্তাক আহমেদের গলায়। তাঁদের কথা অনুযায়ী, “আমরা কিউআর কোড বানিয়ে সমাজমাধ্যমে প্রচার চালিয়েছিলাম, যার ফলে আজ গোটা ভারত ইকবালকে চিনেছে। অথচ মুম্বই যাওয়ার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে একবারও যোগাযোগ করা হলো না।”
তবে সমস্ত মান-অভিমান ভুলে বেলডাঙার প্রতিটি মানুষ এখন ইকবালের দ্রুত আরোগ্য লাভ করে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
