বর্ণবিদ্বেষের শৃঙ্খল ভেঙে নোবেল জয়, কে এই তামিল বংশোদ্ভূত নাভানেথেম ‘নবি’ পিল্লাই? – এবেলা

বর্ণবিদ্বেষের শৃঙ্খল ভেঙে নোবেল জয়, কে এই তামিল বংশোদ্ভূত নাভানেথেম ‘নবি’ পিল্লাই? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

একসময়ে গায়ের রঙের অপরাধে দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারকদের চেম্বারে ঢোকা নিষিদ্ধ ছিল তাঁর। কিন্তু দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও বর্ণবিদ্বেষের সমস্ত অন্ধকার পেছনে ফেলে তিনিই আজ বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার এক উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। ২০২৬ সালের বিশ্বখ্যাত নোবেল শান্তি পুরস্কারে (Nobel Peace Prize) ভূষিত হলেন তামিল বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান অদম্য বিচারক নাভানেথেম ‘নবি’ পিল্লাই (Navanethem ‘Navi’ Pillay)।

আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, বর্ণবাদ-বিরোধী সংগ্রাম এবং বিশ্বজুড়ে গণহত্যা প্রতিরোধে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ৮৫ বছর বয়সী এই সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনারকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার দেওয়া হলো।

বর্ণবিদ্বেষের দিনে চরম সংগ্রাম ও শিক্ষা ডারবানের এক দরিদ্র বাস চালকের ঘরে জন্ম নেওয়া নবি পিল্লাইয়ের পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। বাবা নারায়নসামি নাইডু ও মা সন্তমার আট সন্তানের অন্যতম ছিলেন নাভি। বর্ণবিদ্বেষী শাসনের কঠিন চোখরাঙানি উপেক্ষা করেই ১৯৬৩ সালে নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এবং ১৯৬৫ সালে আইন পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলভাবে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

আইন অঙ্গনে বিপ্লব ও নেলসন ম্যান্ডেলার লড়াই ১৯৬৭ সালে নাটাল প্রদেশে প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে নিজের আইনি সংস্থা গড়ে তোলেন নবি পিল্লাই। সেখান থেকে টানা দুই দশক ধরে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার আন্দোলনের শরিক, বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী রাজনৈতিক বন্দী ও মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষে আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। বর্ণবাদমুক্ত নতুন দক্ষিণ আফ্রিকা গড়ার পর, ১৯৯৫ সালে দেশের সর্বোচ্চ সিভিলিয়ান প্রশাসনে হাইকোর্টের প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ নারী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি ইতিহাস গড়েন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবতাবাদী ভূমিকা ১৯৯২ সালে জেসিকা নিউওয়ার্থের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বখ্যাত নারী অধিকার সংগঠন ‘ইকুয়ালিটি নাও’ (Equality Now), যা বাল্যবিবাহ ও নারীদের যৌনাঙ্গ বিকৃতির (FGM) মতো চরম অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তোলে।

১৯৯৪ সালের ভয়াবহ রুয়ান্ডা গণহত্যার বিচারে গঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা’-র বিচারপতি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এই ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গণহত্যা ও গণধর্ষণে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করেন তিনি। পরবর্তীতে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালে রাষ্ট্রসংঘের প্রথম নারী মানবাধিকার প্রধান (UN High Commissioner for Human Rights) হিসেবে দায়িত্ব নেন নবি পিল্লাই। এমনকি সম্প্রতি গাজায় সংগঠিত গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি।

পেশাগত জীবনে পদে পদে বাধার মুখে পড়া এবং চরম বর্ণবিদ্বেষের শিকার হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নবি পিল্লাইয়ের এই নোবেল জয় আজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ও সম্মানিত হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *