মহাকাশে ‘ভবঘুরে’ দানবীয় ব্ল্যাক হোল! তারা গিলে আলো ছড়াতেই পর্দাফাঁস, তাজ্জব বিজ্ঞানীরা – এবেলা

মহাকাশে ‘ভবঘুরে’ দানবীয় ব্ল্যাক হোল! তারা গিলে আলো ছড়াতেই পর্দাফাঁস, তাজ্জব বিজ্ঞানীরা – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

মহাকাশ বিজ্ঞানে ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর ঘটনা! ছায়াপথের (Galaxy) মূল কেন্দ্র ছেড়ে মহাশূন্যে একা একা ভেসে বেড়ানো এক দানবীয় ‘ভবঘুরে’ কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাসংশ্লিষ্টদের মতে, দুটি ছায়াপথের সংঘর্ষের পর কৃষ্ণগহ্বরগুলো কীভাবে তাদের অবস্থান বদলে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, এই আবিষ্কার সেই সংক্রান্ত প্রচলিত সব ধারণাকেই বদলে দিতে পারে।

আমেরিকার ‘ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা অ্যাট চ্যাপেল হিল’-এর গবেষকদের এই যুগান্তকারী তথ্যটি সম্প্রতি বিখ্যাত ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

ঘটনার নেপথ্যে ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’

গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, মহাজাগতিক এক বিরল ঘটনা—যাকে ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ (TDE) বলা হয়—তার মাধ্যমেই এই ব্ল্যাক হোলের সন্ধান মেলে। যখন কোনো তারা বা নক্ষত্র ভেসে ভাসতে একটি বিশাল ব্ল্যাক হোলের খুব কাছাকাছি চলে আসে, তখন ব্ল্যাক হোলের তীব্র অভিকর্ষ বলের টানে তারাটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এই ধ্বংসলীলার সময় মহাকাশে তৈরি হয় তীব্র আলোর ঝলকানি। অন্ধকার মহাকাশে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য ব্ল্যাক হোলগুলোকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এই আলোই অনেকটা মহাজাগতিক ‘সার্চলাইট’-এর মতো কাজ করে।

কেন এই আবিষ্কার এতটা ব্যতিক্রমী?

সাধারণত ছায়াপথগুলোতে প্রতি এক লাখ বছরে মাত্র একবার এই ধরনের ঘটনা ঘটে। গত এক দশকে চিহ্নিত হওয়া শতাধিক টিডিই-র প্রায় সবগুলোই দেখা গিয়েছিল ছায়াপথের মূল কেন্দ্রে। কারণ বিজ্ঞানের ধারণা ছিল—সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক হোলগুলো সবসময় কেন্দ্রের কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকে।

কিন্তু সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া ‘TDE 2025ABCR’ নামের এই ঘটনাটি সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। এটি ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে ঘটেছে! পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০ লাখ গুণ বেশি ভরের এই ব্ল্যাক হোলটি মহাকাশে একাই ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোটি কোটি বছর আগে দুটি ছায়াপথের সংঘর্ষের ফলে বা অন্য কোনো বড় কৃষ্ণগহ্বরের ধাক্কায় এটি মূল কেন্দ্র থেকে ছিটকে দূরে সরে এসেছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।

এআই (AI)-এর জাদুকরী অবদান

যেহেতু ব্ল্যাক হোলের নিজস্ব কোনো আলো নেই, তাই এদের খালি চোখে বা সাধারণ টেলিস্কোপে খুঁজে পাওয়া প্রায় আসাম্ভব। এই কঠিন কাজটি সহজ করে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

টেলিস্কোপের বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা ‘TDEScore’ নামের একটি বিশেষ এআই (AI) প্রোগ্রাম তৈরি করেন। এআই সিস্টেমটি প্রথাগত কেন্দ্রভিত্তিক অনুসন্ধানের বাইরে গিয়ে ছায়াপথের দূরের অঞ্চলগুলোতে নজর রেখে এই আলোর ঝলকানিটি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে। পরে চিলিতে অবস্থিত ‘SOAR’ টেলিস্কোপের সাহায্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কেবল একটি সূচনা মাত্র। অদূর ভবিষ্যতে ‘ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি’-র মতো অত্যাধুনিক মহাকাশ পর্যবেক্ষণাগারগুলো পুরোদমে চালু হলে, প্রতি বছর এমন শত শত ভবঘুরে ব্ল্যাক হোলের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে কোটি কোটি বছর ধরে এই রহস্যময় কৃষ্ণগহ্বরগুলো কীভাবে মহাবিশ্বে টিকে থাকে ও ঘুরে বেড়ায়, তার বহু অজানা তথ্য মানুষের সামনে উন্মোচিত হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *