মার্কিন হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু নিয়ে মোদীকে তীব্র আক্রমণ রাহুলের, পররাষ্ট্র নীতি ঘিরে উত্তপ্ত রাজনীতি! – এবেলা

মার্কিন হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু নিয়ে মোদীকে তীব্র আক্রমণ রাহুলের, পররাষ্ট্র নীতি ঘিরে উত্তপ্ত রাজনীতি! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌসেনার হামলায় তিন ভারতীয় নাবিকের নির্মম মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ওমান উপকূলের কাছে ‘এমটি সেত্তেবেলো’ নামের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন ফৌজের এই প্রাণঘাতী হামলার পর, কেন্দ্রীয় সরকারের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের সম্মান রক্ষা করতে নরেন্দ্র মোদীর সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী শিবির।

হামলার প্রেক্ষাপট ও প্রাণহানি

গত বুধবার পারস্য উপসাগরে ইরানীয় বন্দরের ওপর জারি করা মার্কিন নৌ-অবরোধ বা ‘ব্লকেড’ লঙ্ঘনের অভিযোগে ‘এমটি সেত্তেবেলো’ জাহাজে হামলা চালায় মার্কিন ফৌজ। ওই বাণিজ্যতরীতে মোট ২৪ জন ভারতীয় ক্রু মেম্বার ছিলেন। মার্কিন আগ্রাসনের মুখে ২১ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও প্রাণ হারান ৩ জন ভারতীয় নাবিক। মৃতরা হলেন— অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের মেরিন ইঞ্জিনিয়ার পাটনালা সুরেশ (৪৪), উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়ার শিবানন্দ চৌরাসিয়া (৩৮) এবং হিমাচল প্রদেশের আদিত্য শর্মা (২৩)। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মৃতদের পরিবারে যেমন শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তেমনই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বিরোধীদের তোপ

ঘটনার পর ভারতের বিদেশ মন্ত্রক মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জেসন মিক্সকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। পাশাপাশি বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও-র সঙ্গে কথা বলে বাণিজ্যিক জাহাজে এই ধরণের প্রাণঘাতী হামলার বিরুদ্ধে ভারতের কড়া আপত্তির কথা জানান। তবে ভারতের এই প্রতিবাদের পর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট যে বিবৃতি প্রকাশ করেছে, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আমেরিকা সাফ জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর নির্দেশ সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজকে অবিলম্বে মেনে চলতে হবে এবং এই অবরোধের কোনওরকম লঙ্ঘন ‘বরদাস্ত করা হবে না’।

আমেরিকার এই অনমনীয় ও হুঁশিয়ারি বার্তাকে ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন বিরোধীরা। মার্কিন বিবৃতির তীব্র সমালোচনা করে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ‘সমঝোতাকারী প্রধানমন্ত্রী’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন হামলায় ভারতীয়দের মৃত্যুর পর আমেরিকার কোনও অনুশোচনা বা ক্ষমা চাওয়ার বালাই নেই, উল্টে তারা হুকুম জারি করে চলেছে। স্বাধীন দেশ হিসেবে ভারতের এই ভাষা সহ্য করা উচিত নয় দাবি করে রাহুল তোপ দাগেন, বর্তমান সরকার ‘আজ্ঞাবহ সেবকের’ মতো সব নির্দেশ শুনছে এবং মেনে চলছে, যা দেশের সম্মানকে ধূলিসাৎ করছে।

একই সুরে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং দলীয় নেতা পবন খেরা ও মণীশ তিওয়ারি মোদী সরকারের পররাষ্ট্র নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। খাড়গের অভিযোগ, এত বড় ঘটনার পরও প্রধানমন্ত্রী জনসমক্ষে কোনও বিবৃতি বা শোকবার্তা দেননি, যা ভারতের বিশ্বজোড়া অবস্থানকে খাটো করছে। বিরোধীদের দাবি, যেখানে ভারতের কড়া ভাষায় ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো উচিত ছিল, সেখানে বিদেশমন্ত্রীর নরম অবস্থান আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের অপমান ডেকে এনেছে।

ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বলবৎ করতেই মার্কিন নৌসেনা পারস্য উপসাগরে এই নৌ-অবরোধ জারি করেছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার কারণেই তারা এই অভিযান চালিয়েছে।

তবে এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারতের মতো একটি উদীয়মান শক্তির নাগরিকদের ওপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই আগ্রাসন দিল্লির কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের ‘বন্ধু দেশ’ আমেরিকার এই কঠোর অবস্থান ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণকে কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। সর্বোপরি, এই ঘটনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ জলসীমায় কর্মরত হাজার হাজার ভারতীয় নাবিক ও শ্রমিকের নিরাপত্তা ও জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে চলেছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মোদী সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *