রাজনৈতিক বৃত্ত কি সম্পূর্ণ? ১৯৯১-এর হারের পুনরাবৃত্তি ২০২৬-এ, এবারও ব্যর্থ ‘অধীরদা’

১৯৯১ সালের সেই নবগ্রাম থেকে ২০২৬ সালের বহরমপুর— বৃত্ত কি তবে সম্পূর্ণ হলো? তিন দশকের বর্ণময় রাজনৈতিক জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলার রাজনৈতিক মহলে। ১৯৯৯ সালে যে নেতা প্রায় আসাম্ভবকে সম্ভব করে ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান ঘটিয়েছিলেন, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে নিজের খাসতালুকেই তাঁর পরাজয় এক যুগের অবসান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৯১ সালে রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে নবগ্রামে পরাজিত হয়েছিলেন অধীররঞ্জন চৌধুরী। তবে সেই পরাজয় দমাতে পারেনি তাঁকে। ১৯৯৬ সালে একই কেন্দ্র থেকে বিপুল ব্যবধানে জিতে বিধানসভায় পা রাখেন তিনি। এরপর ১৯৯৯ সালে বহরমপুর লোকসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসের ভোট অবিশ্বাস্যভাবে বৃদ্ধি করে যে জয়ের সূচনা করেছিলেন, টানা দুই দশক তা অক্ষুণ্ণ ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ইউসুফ পাঠানের কাছে পরাজয়ই ছিল পতনের প্রথম ইঙ্গিত।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
২০২৬-এর নির্বাচন ছিল অধীরের কাছে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের শেষ পরীক্ষা। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে হারের পর যখন তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল, তখন তিনি বেছে নিয়েছিলেন বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রকে। লক্ষ্য ছিল ১৯৯৯ সালের মতো আবারও দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলা। কিন্তু এবারের লড়াই ছিল বহুমাত্রিক। একদিকে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি, অন্যদিকে বিজেপির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। শেষ পর্যন্ত বিজেপির কাছে পরাজিত হয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকতে হলো কংগ্রেসের এই অভিজ্ঞ সেনাপতিকে।
পরাজয়ের কারণ ও রাজনৈতিক প্রভাব
অধীরের এই পরাজয়ের নেপথ্যে একাধিক কারণ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই জেলায় কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামোয় ভাঙন শুরু হয়েছিল। পাশাপাশি, তৃণমূল ও বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতিতে কংগ্রেসের চিরাচরিত ভোটব্যাঙ্ক অনেকটাই আলগা হয়ে যায়। এই হারের ফলে মুর্শিদাবাদ তথা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কংগ্রেসের প্রাসঙ্গিকতা বড়সড় সংকটের মুখে পড়ল। ‘নবাবের গড়ে’ যে একচ্ছত্র আধিপত্য অধীর চৌধুরী বজায় রেখেছিলেন, তার অবসান জেলা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের জন্ম দেবে। তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী মুখ হিসেবে এখন অন্য শিবিরের উত্থান সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
অধীর চৌধুরীর এই পরাজয় কেবল একজন নেতার হার নয়, বরং এটি বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘ তিন দশকের এক ঘরানার সমাপ্তি কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে কাটাছেঁড়া। ইতিহাস যেখানে নবগ্রামের হার দিয়ে শুরু হয়েছিল, বহরমপুরের এই হার কি সেখানেই ইতি টানল? রাজনীতিতে অবসর না থাকলেও, ছাব্বিশের এই ফল অধীরের দীর্ঘ সংসদীয় ও নির্বাচনী কেরিয়ারকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।
