রাজ্যে অবশেষে মিলছে আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা, পাঁচ লক্ষ টাকার নিখরচায় চিকিৎসার তালিকায় কী কী আছে, জেনে নিন বিস্তারিত – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে চালু হতে চলেছে কেন্দ্র সরকারের আয়ুষ্মান ভারত যোজনা। আজ শনিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক বড় ঘোষণায় জানিয়েছেন, আগামী জুলাই মাস থেকেই রাজ্যবাসীর হাতে তুলে দেওয়া হবে আয়ুষ্মান ভারত কার্ড। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলে চিকিৎসার খরচ নিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা অনেকটাই দূর হতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে রাজ্যের গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি এর ফলে সরাসরি উপকৃত হবে।
প্রধানমন্ত্রী জন-আরোগ্য যোজনার (PM-JAY) নিয়ম অনুযায়ী, এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবার পিছু বছরে সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধা পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ নাগরিকরা সম্পূর্ণ আলাদাভাবে আরও পাঁচ লক্ষ টাকার বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবার সুবিধা পাবেন। এর ফলে একই পরিবারে প্রবীণ সদস্য থাকলে মোট সহায়তার পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
১,৯২৯টি চিকিৎসার খরচ মিলবে বিনামূল্যে
আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১,৯২৯টি মেডিক্যাল ও সার্জিক্যাল চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ অসুখ থেকে শুরু করে ক্যানসারের কেমোথেরাপি, হৃদরোগের জটিল অস্ত্রোপচার (বাইপাস), কিডনি ডায়ালাইসিস এবং নিউরোসার্জারির মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল রোগের চিকিৎসাও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা সম্ভব হবে।
হাসপাতালে ভর্তি থেকে ছুটি, সব খরচই থাকবে কার্ডে
এই প্রকল্পের সুবিধা শুধুমাত্র হাসপাতালে ভর্তির দিনগুলিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং চিকিৎসার একটি বড় সময়কালকে এটি সুরক্ষিত করে। এর প্রধান সুবিধাগুলি নিচে দেওয়া হলো-
- হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগের তিন দিন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শের খরচ পাওয়া যাবে।
- হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন ওষুধ, ইনটেনসিভ কেয়ার (ICU) সার্ভিস এবং হাসপাতালের বেড ভাড়া ও খাবারের খরচ বহন করবে এই যোজনা।
- জটিল অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মেডিক্যাল ইমপ্ল্যান্টের খরচও এর অন্তর্ভুক্ত।
- হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়ার পর পরবর্তী ১৫ দিন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ, ফলো-আপ চিকিৎসা ও সেবার সম্পূর্ণ খরচ এই কার্ডের মাধ্যমেই মেটানো যাবে।
কোন কোন জটিল রোগের চিকিৎসা করা যাবে?
আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের মাধ্যমে মূলত অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা ক্ষেত্রগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর সুনির্দিষ্ট তালিকাটি নিম্নরূপ-
- কার্ডিওলজি: ওপেন হার্ট সার্জারি, পেসমেকার ইমপ্লান্টেশন ও অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি সহ হৃদরোগের যাবতীয় চিকিৎসা।
- অনকোলজি: ক্যানসার রোগীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি এবং টিউমার বা ক্যানসারের অস্ত্রোপচার।
- নিউরোসার্জারি: মস্তিষ্কের জটিল অপারেশন, স্পাইন সার্জারি ও স্নায়ু সংক্রান্ত যাবতীয় গুরুতর রোগ।
- নেফ্রোলজি: কিডনি বিকল রোগীদের জন্য নিয়মিত ডায়ালাইসিস এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো বড় চিকিৎসা।
- অর্থোপেডিক: জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট (হাঁটু বা কোমর প্রতিস্থাপন), হাড়ের ফ্র্যাকচার ও অন্যান্য বড় ধরনের অস্ত্রোপচার।
- গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি: লিভারের গুরুতর সমস্যা এবং পেটের সমস্ত জটিল অপারেশন।
- অন্যান্য চিকিৎসা: চোখের ছানি অপারেশন, কানের সার্জারি এবং মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া রোগীদের প্লাস্টিক সার্জারি ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গে এই স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প চালু করার সিদ্ধান্ত রাজ্যবাসীর জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতদিন ক্যানসার বা হৃদরোগের মতো চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে বহু নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত, কিংবা ঘটিবাটি বিক্রি করতে বাধ্য হতো। জুলাই মাস থেকে কার্ড বণ্টন শুরু হলে সেই আর্থিক বিপর্যয় অনেকটাই রোখা সম্ভব হবে। একই সাথে, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি অনুমোদিত বেসরকারি হাসপাতালগুলিতেও এই সুবিধা পাওয়ার কারণে রাজ্যের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও চিকিৎসার গুণগত মান উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
