সারদা কেলেঙ্কারিতে ১২ বছর জেল খাটলেও শুরু হয়নি বিচার, পুলিশ ও সিবিআইকে তীব্র ভর্ৎসনা হাইকোর্টের

সারদা কেলেঙ্কারিতে ১২ বছর জেল খাটলেও শুরু হয়নি বিচার, পুলিশ ও সিবিআইকে তীব্র ভর্ৎসনা হাইকোর্টের

সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারির এক দশক পেরিয়ে গেলেও কেন বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো না, তা নিয়ে নজিরবিহীন ক্ষোভ প্রকাশ করল কলকাতা হাইকোর্ট। মূল অভিযুক্ত সুদীপ্ত সেনের জামিন মামলার শুনানিতে রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই—উভয়কেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ। দীর্ঘ ১২ বছর বিনা বিচারে কারাবাস নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ, এভাবে কাউকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখা যায় না।

তদন্তের মন্থর গতি ও আইনি জটিলতা

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে সুদীপ্ত সেন কারাবন্দি। তার আইনজীবীর দাবি অনুযায়ী, সারদা মামলায় মোট ৩৮৯টি অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে সিবিআই ৭৬টি মামলার দায়িত্ব নিলেও মাত্র ৪টিতে চার্জশিট দিয়েছে, যেগুলোতে সেন ইতিমধ্যেই জামিন পেয়েছেন। বর্তমান আইনি জটিলতা মূলত রাজ্য পুলিশের হাতে থাকা ৩০৮টি মামলাকে কেন্দ্র করে। বর্তমানে বারাসাত থানার মাত্র দুটি মামলার কারণে তাঁর মুক্তি আটকে রয়েছে। ২০১৪ সালে চার্জশিট জমা পড়ার পরেও কেন ট্রায়াল শুরু হয়নি, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে আদালত। এমনকি একটি মামলার নথি হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাকেও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চরম নিদর্শন হিসেবে দেখছেন বিচারপতিরা।

সম্পত্তি বিক্রিতে বড়সড় দুর্নীতির ইঙ্গিত

শুনানির সবচেয়ে নাটকীয় মোড় আসে সারদার সম্পত্তি বিক্রির তথ্য সামনে আসার পর। আদালতে পেশ করা রিপোর্টে দেখা গেছে, সংস্থার ৯টি বিলাসবহুল বাংলো এবং একটি ফ্ল্যাট মাত্র ৫২ লক্ষ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। বাজারমূল্যের চেয়ে এত কম দামে কীভাবে সম্পত্তি বিক্রি হলো এবং এর পেছনে কারা জড়িত, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। এই অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে আদালত বিস্তারিত কৈফিয়ত তলব করেছে।

আমানতকারীদের ভবিষ্যৎ ও আদালতের কড়া অবস্থান

আদালতের মতে, অভিযুক্ত জামিন পেলে আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে টাকা ফেরানোর জন্য গঠিত কমিটির কাজের গতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০ হাজার আবেদনের মধ্যে মাত্র ৫০০টি নিষ্পত্তি হওয়াকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে মনে করছে আদালত। সিবিআই-এর উদ্দেশে বিচারপতির প্রশ্ন ছিল, শুধুমাত্র জামিনের বিরোধিতা করাই কি সংস্থার কাজ, ট্রায়াল শেষ করার কোনো দায়বদ্ধতা কি তাদের নেই?

পরবর্তী পদক্ষেপ

আগামী ২৩ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন সারদা ও তালুকদার কমিটিকে সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান, উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ এবং আমানতকারীদের পাওনার বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোর গাফিলতি সুদীপ্ত সেনের জেলমুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

একঝলকে

  • দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বিনা বিচারে জেলে রয়েছেন সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেন।
  • রাজ্য পুলিশ ও সিবিআই-এর তদন্তের ধীরগতিতে তীব্র অসন্তোষ কলকাতা হাইকোর্টের।
  • ৯টি বাংলো ও ১টি ফ্ল্যাট মাত্র ৫২ লক্ষ টাকায় বিক্রির ঘটনায় দুর্নীতির সন্দেহ।
  • ২০ হাজার আমানতকারীর মধ্যে মাত্র ৫০০ জনের টাকা ফেরানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
  • আগামী ২৩ এপ্রিল সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান ও হিসেব জমা দেওয়ার নির্দেশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *