সিলিং ফ্যানেও যেন লুকিয়ে রয়েছে মরণফাঁদ, প্রাক্তন আইএএস অফিসারের মর্মান্তিক মৃত্যুতে বাড়ছে এসির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
দিল্লিতে অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক তথা প্রতিযোগিতা কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান ধনেন্দ্র কুমারের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের (এসি) নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড়সড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ দিল্লির হাউজ খাসের একটি বহুতলে এসি থেকে লাগা আগুনে ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর। এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাঁর ছেলেও। পুলিশ ও প্রাথমিক তদন্তকারীদের অনুমান, ঘরের ভেতরের এসির অংশ থেকেই এই ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত। উত্তর ভারতের তীব্র দাবদাহের মধ্যে এই ঘটনা এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা ও যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কেন হঠাৎ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে এসি
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেকেই দিনের পর দিন একটানা এসি চালিয়ে রাখেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যন্ত্রকে পর্যাপ্ত বিরতি না দিয়ে একটানা ব্যবহার করার ফলে এর প্রধান অংশ অর্থাৎ সংকোচক বা কম্প্রেসরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় বৃদ্ধি পায় এবং একপর্যায়ে তা থেকে আগুন লাগা বা বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া, দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ চলাচলের কারণে ভেতরের তারে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়ে তার গলে যায় এবং শর্ট সার্কিট সৃষ্টি হয়। দিল্লি অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ শর্ট সার্কিট, বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপ, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং অতিরিক্ত উত্তাপের মতো বৈদ্যুতিক গোলযোগ।
এর পাশাপাশি ভোল্টেজের ঘন ঘন ওঠানামাও এই ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ। আচমকা বিদ্যুতের প্রবাহ বেড়ে বা কমে গেলে এসির সংবেদনশীল অংশগুলো বিকল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, এসির শীতলীকরণ গ্যাস লিক করলে বা পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে যন্ত্রকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়, যা ভেতরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে ধুলো জমে বায়ু চলাচল বন্ধ হওয়া, তারের আবরণ ফেটে যাওয়া কিংবা সংযোগ আলগা হয়ে যাওয়ার কারণেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রতিরোধের উপায় ও সম্ভাব্য প্রভাব
এই ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়াতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু জরুরি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। প্রথমত, এসি একটানা না চালিয়ে মাঝে মাঝে বন্ধ রেখে যন্ত্রটিকে বিরতি দিতে হবে। ঘরের তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখলে কম্প্রেসরের ওপর চাপ কম পড়ে। এছাড়া, এসির এয়ার ফিল্টার বা বায়ু ছাঁকনি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং বাইরের অংশে যেন কোনো আবর্জনা না জমে, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসির যেকোনো ধরণের মেরামত বা সংযোগ স্থাপনের কাজ সবসময় অনুমোদিত কারিগর বা টেকনিশিয়ানকে দিয়েই করানো উচিত। একই সাথে ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভালো মানের স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা এবং ক্ষুদ্র স্বয়ংক্রিয় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্নকারী যন্ত্র (এমসিবি) ও ফিউজ ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। এসির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, হিসহিস শব্দ হওয়া, পর্যাপ্ত ঠান্ডা না হওয়া বা বরফ জমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবহেলা না করে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রাক্তন আইএএস অফিসারের এই মর্মান্তিক মৃত্যু দেশজুড়ে এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিকে পুনরায় কঠোরভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
