১৫ বছরের সাম্রাজ্যে ধস, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ভরাডুবির নেপথ্যে ৫ কারণ

১৫ বছরের সাম্রাজ্যে ধস, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ভরাডুবির নেপথ্যে ৫ কারণ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পটপরিবর্তন ঘটিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান হতে চলেছে। সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার পথে। তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরাজয় মানতে অস্বীকার করলেও, নির্বাচনী তথ্য ও গ্রাউন্ড রিয়ালিটি শাসক দলের বিপর্যয়ের পেছনে গভীর কিছু কারণ নির্দেশ করছে।

সুরক্ষা ও দুর্নীতি ইস্যুতে নারী ভোটব্যাংকে ধস

তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘকালীন সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল নারী ভোটাররা। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বা ‘কন্যাশ্রী’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে মমতা ব্যানার্জী নারী হৃদয়ে যে স্থান করে নিয়েছিলেন, এবার তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক খুনের ঘটনায় রাজ্যজুড়ে যে গণ-আন্দোলন তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব পড়েছে ব্যালট বক্সে। জলহাটির মতো তৃণমূলের দুর্গে আরজি করের নির্যাতিতার মায়ের বিপুল জয় প্রমাণ করে যে, নারী নিরাপত্তা ও বিচারহীনতার প্রশ্নে ক্ষুব্ধ মহিলারা শাসক দলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

ভোটার তালিকা সংশোধন ও মেরুকরণের সমীকরণ

এবারের নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে আরও দুটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং হিন্দু ভোটের মেরুকরণ। এসআইআর-এর ফলে তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়ায় তৃণমূল সাংগঠনিকভাবে বড় ধাক্কা খেয়েছে। বিজেপির দাবি অনুযায়ী, ভুয়া ভোটারদের বাদ পড়ায় তৃণমূলের ‘অনৈতিক সুবিধা’ বন্ধ হয়েছে। পাশাপাশি, মুসলিম ভোটের একচেটিয়া সমর্থনে ভাগ বসানো এবং পাল্টা হিন্দু ভোটের মেরুকরণ বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে। মালদা বা মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম প্রধান জেলাগুলোতেও বিজেপি আসন পাওয়ায় স্পষ্ট যে, মমতার ‘সফট হিন্দুত্ব’ কার্ড ভোটারদের মন গলাতে পারেনি।

প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ হারানো ও দুর্নীতির মাশুল

দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার ফলে সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া বা ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ তৃণমূলকে কোণঠাসা করেছে। শিক্ষা দুর্নীতি, কাটমানি সংস্কৃতি এবং সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার ভোটে প্রতিফলিত হয়েছে। এছাড়া, অভূতপূর্ব সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনীর মোতায়েন এবং নির্বাচন কমিশনের কঠোর নজরদারির কারণে শাসক দল লোকাল পুলিশ ও প্রশাসনের যে বাড়তি সুবিধা সাধারণত পেয়ে থাকে, তা এবার অনুপস্থিত ছিল। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ এবং ভোটারদের অবাধ অংশগ্রহণ পরোক্ষভাবে বিজেপিকেই রাজনৈতিক মাইলেজ দিয়েছে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ক্ষমতার পালাবদল এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *