৩০ বছরের গেরুয়া দুর্গে প্রচ্ছন্ন ধস: বাঁকিপুরে জয়ী হয়ে ‘জন নেতা’ হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের রাজকীয় আত্মপ্রকাশ! – এবেলা

৩০ বছরের গেরুয়া দুর্গে প্রচ্ছন্ন ধস: বাঁকিপুরে জয়ী হয়ে ‘জন নেতা’ হিসেবে প্রশান্ত কিশোরের রাজকীয় আত্মপ্রকাশ! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

বিহারের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিল বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফল। টানা ৩০ বছর ধরে বিজেপির দখলে থাকা এবং গেরুয়া শিবিরের অন্যতম নিরাপদ দুর্গ হিসেবে পরিচিত বাঁকিপুরে জয়ী হয়েছেন ‘জন সুরাজ’ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর (PK)। তিনি ৬৩,২০৩ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির নীরজ কুমার সিনহাকে (৪৪,২৫০ ভোট) ১৮,৯৫৩ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।

গত ২০২৫ বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রেই জন সুরাজের প্রার্থী পেয়েছিলেন মাত্র ৭,৭১৭ ভোট, আর বিজেপির নীতিন নবীন পেয়েছিলেন প্রায় ৯৮ হাজার ভোট। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিজেপির ভোট ৪৪ হাজারে নেমে আসা এবং প্রশান্ত কিশোরের ভোট ৬৩ হাজারে পৌঁছানো বিহার রাজনীতির অনেক পুরনো হিসাবকে বদলে দিয়েছে। জয়ের পর প্রশান্ত কিশোর কটাক্ষ করে বলেন, “বিজেপির ৩০ বছরের দুর্গ আমি ৩০ দিনে ভেঙে দিয়েছি।”

১. বিজেপির জন্য শিক্ষা: ‘ক্যাপটিভ ভোট’ বলে কিছু হয় না

বাঁকিপুর পাটনা শহরের একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত, যেখানে উচ্চবর্ণ, শহুরে মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী ভোটাররা দীর্ঘ দিন ধরে বিজেপির মূল শক্তি। বিজেপি ধরে নিয়েছিল এই ‘ক্যাপটিভ ভোটব্যাঙ্ক’ চিরকাল তাদের পাশেই থাকবে। কিন্তু প্রশান্ত কিশোরের জয় সেই আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিল।

  • ভোটারদের অনীহা: মাত্র ৩৪.২৪% ভোটদান প্রমাণ করে যে দলের নিশ্চিত সমর্থকরাও এবার বুথে আসেননি।
  • প্রার্থী নির্বাচনের বিশৃঙ্খলা: নীতিন নবীন রাজ্যসভায় যাওয়ার পর বিজেপি প্রথমে অভিষেক কুমার সিনহাকে প্রার্থী করে। কিন্তু তিনি হঠাৎ সরে দাঁড়ালে শেষ মুহূর্তে তরুণ নেতা নীরজ সিনহাকে দাঁড় করানো হয়। বিজেপির মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ দলের এই সিদ্ধান্তহীনতা কর্মী ও ভোটারদের আত্মবিশ্বাসে বড় আঘাত হেনেছে।

২. তেজস্বী ও আরজেডি-র জন্য শিক্ষা: ‘ডিফল্ট বিরোধী’ হওয়ার দিন শেষ

এই নির্বাচনে বিজেপির পরাজয়ের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ আরজেডি-র ৩ নম্বর স্থানে নেমে যাওয়া। এতদিন বিহারে এনডিএ-র ওপর কোনো অসন্তোষ তৈরি হলে তার লাভ পেত লালু-তেজস্বীর আরজেডি। কিন্তু বাঁকিপুরে বিজেপির ভোট কমলেও তেজস্বীরা তার সুযোগ নিতে পারেননি।

  • সামাজিক সমীকরণের পরিবর্তন: শুধু লালুপ্রসাদের মুসলিম-যাদব (MY) সমীকরণ বা বিজেপিবিরোধিতার ওপর ভর করে তরুণ ও শহুরে ভোটারদের আটকে রাখা যাবে না। ভোটাররা এখন শাসন, শিক্ষা, উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প খুঁজছেন, যা প্রশান্ত কিশোর তুলে ধরতে পেরেছেন।

৩. রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে ‘জন নেতা’ প্রশান্ত কিশোর

এতদিন প্রশান্ত কিশোরকে কেবল পেছনের সারির নির্বাচনী রণকৌশলী বা পরামর্শদাতা মনে করা হতো। কিন্তু জন সুরাজ গঠনের পর বিহারের গ্রামে গ্রামে পদযাত্রা এবং প্রান্তিক মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন তাঁকে একজন রাস্তায় থাকা নেতার পরিচিতি দিয়েছে।

বাঁকিপুরের জয় প্রমাণ করল:

  1. প্রশান্ত কিশোরের নিজস্ব সর্বজনগ্রাহ্যতা তৈরি হয়েছে।
  2. জন সুরাজের দলীয় প্রতীককে বাস্তব ভোটে রূপান্তর করার ক্ষমতা রয়েছে।
  3. বিজেপি ও আরজেডি — উভয় শিবির থেকেই ভোট টানার শক্তি রয়েছে তাঁর।

চূড়ান্ত বার্তা

একটি শহরের উপনির্বাচন দিয়ে সমগ্র বিহারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। গ্রামীণ এলাকা ও জাতপাত-নির্ভর আসনে এই মডেল কতটা কাজ করবে, তা সময়ই বলবে। তবে বাঁকিপুরের জয় স্পষ্ট বার্তা দিল — বিহারের রাজনীতিতে দুই প্রধান শিবিরের (NDA ও RJD) বাইরে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় মেরু’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা এখন আর কেবল তত্ত্ব নয়, তা বাস্তবায়িত হতে শুরু করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *