আইন ছাপিয়ে মধ্য এশিয়ায় এখনও দাপট দেখাচ্ছে কনে অপহরণের বর্বর প্রথা – এবেলা

আইন ছাপিয়ে মধ্য এশিয়ায় এখনও দাপট দেখাচ্ছে কনে অপহরণের বর্বর প্রথা – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়েও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নারী স্বাধীনতার লড়াই অব্যাহত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগেও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক আদিম ও মধ্যযুগীয় সামাজিক ব্যাধি। কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানের মতো দেশগুলির গ্রামীণ অঞ্চলে বিয়ের নামে ‘কনে অপহরণ’ করার এক ভয়ঙ্কর প্রথা আজও সগৌরবে টিকে রয়েছে, যেখানে মেয়েদের কিংবা তাঁদের পরিবারের সম্মতির বিন্দুমাত্র পরোয়া করা হয় না।

ঐতিহ্যের অপভ্রংশ ও পুরুষতান্ত্রিক রূপান্তর

কাজাখস্তানের ইতিহাসে এই প্রথাটি স্থানীয় ভাষায় ‘আলিপ কাশু’ নামে পরিচিত, যার আদি অর্থ ছিল ‘পালিয়ে নিয়ে যাওয়া’। এক সময় বিয়ের খরচ কমাতে এবং ছেলে-মেয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে পরিবারের সায় নিয়ে এই প্রথার চল ছিল। কিন্তু সময়ের আবর্তে এই রেওয়াজ সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক ও হিংসাত্মক রূপ ধারণ করেছে। এখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো মেয়ে বা কিশোরীকে পছন্দ হলেই একদল পুরুষ কেমিক্যালের মাধ্যমে অজ্ঞান করে তুলে নিয়ে আসে। জ্ঞান ফেরার পর সম্পূর্ণ অচেনা পরিবেশে ভয়ার্ত মেয়ের মাথায় সাদা কাপড় পরিয়ে জোরপূর্বক বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।

সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও আইনি নিষ্ক্রিয়তা

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বর্বর প্রথা টিকিয়ে রাখার পেছনে কাজ করছে গ্রামীণ অঞ্চলের চরম লৌকিক ও অর্থনৈতিক মনস্তত্ত্ব। মেয়েকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে দেওয়ার খরচ এড়াতে অনেক দরিদ্র পরিবার এই অপহরণকে একপ্রকার ভাগ্য মেনে মুখ বুজে সহ্য করে নেয়। ‘লোকে কী বলবে’ এই সামাজিক ভয়ে সিংহভাগ পরিবার আইনের দ্বারস্থ হয় না। সমীক্ষা অনুযায়ী, কাজাখস্তানে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার এমন অপহরণের ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীরা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। অথচ বিগত কয়েক বছরে আদালতে অভিযোগ জমা পড়েছে মাত্র ২১ internees বা ২১৪টি।

কাজাখস্তানে ১৯৯৪ সাল থেকেই এই অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে, যা ২০১৩ সালে সংশোধন করে ৫ থেকে ৭ বছর এবং নাবালিকা অপহরণের ক্ষেত্রে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করা হয়। ২০২১ সাল থেকে কিরগিজস্তানেও অনুরূপ আইন বলবৎ রয়েছে। কিন্তু সরকারি প্রচারের অভাব এবং প্রশাসনের উদাসীনতায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষ এই আইন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।

ভবিষ্যতের অন্ধকার ও সম্ভাব্য প্রভাব

কড়া আইন থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত প্রয়োগ এবং সচেতনতার অভাবে এই অপরাধ প্রবণতা কমছে না। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের মানসিক ও শারীরিক সুরক্ষা চরম হুমকির মুখে পড়ছে। জোরপূর্বক বিয়ে এবং নির্যাতনের কারণে নারীদের দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা ও আত্মহত্যার মতো প্রবণতা বাড়ছে, যা সামগ্রিক নারী প্রগতির পথকে রুদ্ধ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের নারীসুরক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে কাজাখস্তান প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে। তবে এই অন্ধকার সংস্কৃতি থেকে মধ্য এশিয়ার নারীরা কবে মুক্তি পাবেন, তা সময়ই বলবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *