ইরান যুদ্ধে চিনের মাস্টারস্ট্রোক আর বিপাকে আমেরিকার অর্থনীতি

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের আবহে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই যুদ্ধের আড়ালে আসল ‘খেলা’ খেলছে চিন। তেহরান ও বেজিংয়ের এই যুগলবন্দি কার্যত আমেরিকার ডলারের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে, যার ফলে মার্কিন অর্থনীতি বড় ধরনের ধসের সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডলারের সাম্রাজ্যে চিনের হানা
বিশ্বের তেলের বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন বর্তমানে মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হয়। জেপি মর্গান চেজ-এর ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য অনস্বীকার্য। তবে ইরান ও চিন এই সমীকরণ বদলে দিতে মরিয়া। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ইরান, বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চিনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-কে ডলারের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে বেজিং।
তেহরান ও বেজিংয়ের লাভজনক সমীকরণ
ইরান ও চিনের এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা দুই দেশের জন্যই ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর মূল কারণগুলি হলো:
- মার্কিন আধিপত্য খর্ব: ডলারের মাধ্যমে লেনদেন বন্ধ হলে আমেরিকার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
- বিকল্প মুদ্রা হিসেবে ইউয়ান: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে চিনের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং ইউয়ান ‘গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি’ হওয়ার পথে এগিয়ে যাবে।
- নিষেধাজ্ঞা এড়ানো: মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই ইরান তার তেল রফতানি চালিয়ে যেতে পারছে। বিনিময়ে চিন থেকে ভারী যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম আমদানি করছে তারা।
- সাশ্রয়ী বাণিজ্য: ইউয়ানে লেনদেনের ফলে ডলারের ক্রমবর্ধমান মূল্যের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে, যা চিনের জন্য সস্তায় তেল কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে।
পেট্রোইউয়ান এবং আগামীর বিশ্ব বাজার
ইরান ইতিমধ্যেই তাদের মোট তেল রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি চিনের কাছে বিক্রি করছে। জিম্বাবোয়েতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘পেট্রোইউয়ান’ চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে। তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবেও ইরান থেকে চিনে তেল সরবরাহ কমেনি। যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরান প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৩৭ লক্ষ ব্যারেল তেল রফতানি করেছে, যার সিংহভাগই গিয়েছে চিনে।
হরমুজ প্রণালীর টোল বুথগুলোতেও ইরান এখন ইউয়ানে লেনদেন শুরু করেছে। এই পদক্ষেপটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদি এই ধারা বজায় থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ওয়াশিংটনের একচেটিয়া দাদাগিরি শীঘ্রই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিতে পারে।
একঝলকে
- বিশ্বের তেলের বাজারের ৮০ শতাংশ লেনদেন ডলারে হলেও এখন বিকল্প হিসেবে ইউয়ান উঠে আসছে।
- ইরানের তেল রফতানির ৮০ শতাংশই বর্তমানে চিন কিনছে এবং এই লেনদেন প্রধানত ইউয়ানে হচ্ছে।
- হরমুজ প্রণালীতে প্রভাব খাটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের একাধিপত্য ভাঙতে চাইছে চিন-ইরান জোট।
- আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ‘পেট্রোইউয়ান’ চালুর মাধ্যমে মার্কিন অর্থনীতিকে বিপাকে ফেলার ছক তৈরি।
- যুদ্ধের মধ্যেও ইরান থেকে চিনে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, যা বেজিংয়ের কৌশলগত জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
