‘এসআইআরে নাম বাদ মানেই বিদেশি নয়’! সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে বড় মোড়, উঠছে সামাজিক প্রকল্পের প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়া দিল্লি: ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে চলা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক রায় দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণ বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং সাংবিধানিক। তবে একই সঙ্গে আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ— ভোটার তালিকা থেকে কারো নাম বাদ যাওয়ার অর্থই এই নয় যে তিনি ‘বিদেশি’ বা ভারতের নাগরিক নন। নাগরিকত্ব নির্ধারণ বা তা কেড়ে নেওয়ার কোনো একচেটিয়া অধিকার নির্বাচন কমিশনের নেই।
৪৯ দিনের ম্যারাথন শুনানি ও সুপ্রিম কোর্টের ১২৪ পাতার রায়
বিহারের এসআইআর সংক্রান্ত মামলাকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের ৭ জুলাই সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ ৪৯ দিন ধরে চলা ম্যারাথন শুনানির পর গত ২৯ জানুয়ারি রায় সংরক্ষিত (Reserve) রেখেছিল আদালত। অবশেষে দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ এই বিষয়ে ১২৪ পাতার এক বিস্তারিত রায় প্রকাশ করেছে।
রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা আর নাগরিকত্ব চলে যাওয়া এক জিনিস নয়। নাগরিকত্ব বিচারের প্রকৃত ক্ষমতা রয়েছে একমাত্র কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের হাতে। নির্বাচন কমিশন বড়জোড় ভোটার হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নাগরিক কিনা তা খতিয়ে দেখতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক্তিয়ার তাদের নেই।
চার সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে তালিকা পাঠানোর নির্দেশ
শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভোটার তালিকায় যাদের নাম নেই, সেই তালিকা আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন মোতাবেক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বা সংশ্লিষ্ট অথরিটি রাজ্যে পরবর্তী যেকোনো নির্বাচনের (লোকসভা, বিধানসভা বা পুরভোট) আগেই এই বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের বিষয়টি খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এর মধ্যে বাদ পড়া ব্যক্তিরা উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সহ সরকারের কাছে পুনরায় নাম তোলার আবেদন করতে পারবেন এবং সরকারকে সন্তুষ্ট করতে পারলে ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম আবার যুক্ত করা হবে।
বাংলায় প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ নিয়ে তুঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক
বিহারের মামলার প্রেক্ষিতে এই রায় এলেও, এর সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে পশ্চিমবঙ্গেও। বিশেষত এ রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের এক সাম্প্রতিক ঘোষণার পর এই রায় রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রাজ্য সরকার জানিয়েছিল, এসআইআর-এ যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে বা যাঁরা ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন, তাঁরা সরকারি সামাজিক প্রকল্পের (যেমন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার ইত্যাদি) সুবিধা পাবেন না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী দলগুলি।
তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায় এই প্রসঙ্গে রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে বলেন, “সুপ্রিম কোর্টই যেখানে রায় দিচ্ছে যে ভোটার তালিকায় নাম বাদ মানেই কাউকে বিদেশি বলা যায় না, সেখানে রাজ্য সরকার কীভাবে নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে পারে? এই নির্দেশ সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অমানবিক।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাড়াহুড়ো করে লক্ষাধিক নাম বাদ দিয়ে ভোটের আগে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাংলায় এমন ৩১টি আসন রয়েছে, যেখানে এসআইআর-এ বাদ পড়া নামের সংখ্যা জয়ের মার্জিনের চেয়েও বেশি।
একই সুর শোনা গিয়েছে প্রখ্যাত আইনজীবী তথা কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ অভিষেক মনু সিংভির গলাতেও। তিনি মন্তব্য করেন, “নাগরিকত্ব বিচারের ক্ষমতা কমিশনের নেই, অথচ সেই তকমা দিয়েই নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে তো ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীদের প্রায় ৮০ শতাংশেরই নাম পুনরায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ভোটের আগে এই নামগুলো থাকলে নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হতেই পারত।” সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর একদিকে যেমন এসআইআর-এর আইনি বৈধতা বজায় রইল, অন্যদিকে বাদ পড়াদের নাগরিকত্ব ও সামাজিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন করে চাপে পড়ল রাজ্য প্রশাসন।
