‘কটূক্তি সহ্য করেছি, এবার নিশ্চিন্তে ঘুমোব!’ দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ফের সরকারি চাকরি পেলেন অনামিকা রায় – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি পাওয়া, এরপর ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর আনন্দে ভরপুর জীবন—সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু হুট করেই চাকরি হারানোর ধাক্কা, বছরের পর বছর আদালতের লড়াই, অনিশ্চয়তা আর সমাজের কটূক্তি জীবনকে একসময় নরককুণ্ড করে তুলেছিল। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও নিজের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখলেন শিলিগুড়ির অনামিকা রায়। ঘুচে গেল তাঁর ‘চাকরিহারা’ তকমা। আপার প্রাইমারি পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন করে সরকারি চাকরি পেয়ে এবার উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরের বেলঝাড়ি জুনিয়র হাই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করতে চলেছেন তিনি।
এসএসসি বিতর্কে বারবার আলোচিত মুখ
রাজ্যের এসএসসি নিয়োগ-জটিলতার ইতিহাসের সঙ্গে অনামিকা রায়ের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ২০১৬ সালের এসএসসি প্যানেলে প্রাক্তন মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতা অধিকারীর চাকরি বেআইনি প্রমাণিত হওয়ার পর সেই পদে চাকরি পান ববিতা সরকার। পরবর্তীতে ববিতার মার্কশিটে নম্বর নিয়ে গরমিল ধরা পড়লে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তাঁর চাকরি বাতিল হয় এবং সেই শূন্যপদেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসেবে নিযুক্ত হন অনামিকা। ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজগঞ্জ ব্লকের মনুয়াগঞ্জের আমবাড়ি হরিহর হাইস্কুলে তিনি শিক্ষকতাও শুরু করেন।
চাকরি যাওয়ার ধাক্কা ও সামাজিক কটূক্তি
তবে সেই আনন্দ বেশিদিন টেকেনি। ২০১৬ সালের এসএসসির সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল হয়ে যাওয়ায় ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের রায়ের কোপে পড়ে তাঁর চাকরিও চলে যায়। যদিও সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বেতন পাওয়ার সুযোগ পেলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা কাটছিল না। অনামিকা এক বেসরকারি সংবাদমাধ্যমকে জানান, স্কুলে যাওয়ার পথে তাঁকে প্রায়ই শুনতে হতো— ‘চাকরিটা এখনও আছে তো?’, কিংবা ‘টাকা দিয়ে চাকরি পেতে হয়েছিল নাকি?’ এই ধরনের কটাক্ষ এবং ৩১ আগস্টের পর কী হবে, সেই চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল তাঁর।
অবশেষে আপার প্রাইমারির হাত ধরে স্বস্তি
এই চরম অনিশ্চয়তার মাঝেই ২০১৫ সালের আপার প্রাইমারি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আদালতের নতুন রায় স্বস্তি নিয়ে আসে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ১,১৭৭ জন প্রার্থীর কাউন্সেলিং ও সুপারিশপত্র দেওয়ার কাজ শুরু করে এসএসসি। গত ২১ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত চলা সেই কাউন্সেলিংয়ে নাম ছিল অনামিকারও এবং শেষ দিনে তাঁর হাতে এসে পৌঁছায় কাঙ্ক্ষিত নিয়োগপত্র। নতুন কর্মস্থল হিসেবে তিনি পেয়েছেন উত্তর দিনাজপুরের বেলঝাড়ি জুনিয়র হাই স্কুল।
নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় অনামিকা জানান, পরীক্ষায় পাশ করার পরেও দীর্ঘদিন ধরে নানা টালবাহানা চলেছিল, যার জেরে চরম মানসিক অশান্তিতে ভুগেছেন তিনি। তবে অবশেষে স্বস্তি মিলেছে এবং দ্রুত নতুন স্কুলে যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ায় এখন অন্তত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন তিনি।
তবে ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের মামলায় সুপ্রিম কোর্টে যদি শেষ পর্যন্ত আগের রায় বদলে যায়, তবে কি তিনি আবার পুরনো স্কুলে ফিরে যাবেন? এই প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেলেও আপাতত সেই নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ অনামিকা। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর পাওয়া এই নতুন চাকরিই তাঁর কাছে এখন জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
