জিনপিংয়ের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ ট্রাম্পের? কোন লোভে তাইওয়ান নীতি বিকিয়ে দিল আমেরিকা! – এবেলা

জিনপিংয়ের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ ট্রাম্পের? কোন লোভে তাইওয়ান নীতি বিকিয়ে দিল আমেরিকা! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

চীনের রাজধানী বেজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনের হাই-প্রোফাইল সম্মেলন শেষ করেই এক বিস্ফোরক বয়ান দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের পুরনো পররাষ্ট্রনীতি একঝটকায় বদলে দিয়ে ট্রাম্প তাইওয়ানকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন, তারা যেন চীন থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ স্বাধীন ঘোষণা করার ভুল না করে। ট্রাম্পের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বিশ্ব কূটনীতিতে এক বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গতকাল পর্যন্ত যে আমেরিকা তাইওয়ানের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, আজ সেই ট্রাম্প তাইওয়ানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রযুক্তি চুরির অভিযোগ তুলছেন।

ভূগোল ও সামরিক শক্তির সমীকরণ টেনে ট্রাম্প তাইওয়ানকে একটি ‘কঠিন সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, চীন একটি বিশাল ও অত্যন্ত শক্তিশালী দেশ, যার তুলনায় তাইওয়ান অত্যন্ত ছোট। ভৌগোলিক দূরত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাইওয়ান চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ৫৯ মাইল দূরে অবস্থিত, যেখানে আমেরিকা থেকে এর দূরত্ব সাড়ে ৯ হাজার মাইল। ফলে আমেরিকার পক্ষে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জটিল ও চর্তুমুখী চ্যালেঞ্জের বিষয়।

অর্থনৈতিক লাভ নাকি ইরানের পরমাণু সংকট, নেপথ্যের আসল খেলা

ট্রাম্পের এই নীতিগত ইউ-টার্নের পেছনে মূলত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে দুটি বড় অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রথমত, এর পেছনে রয়েছে এক বিশাল বাণিজ্যিক চুক্তি। চীনের সরকারি সংস্থাগুলো মার্কিন বিমান প্রস্তুতকারক কো ম্পা নি ‘বোয়িং’ থেকে প্রাথমিকভাবে ২০০টি যাত্রীবাহী বিমান কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে ট্রাম্পের কাছে এই বিলিয়ন ডলারের চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ক্রমবর্ধমান পরমাণু সংকট মোকাবিলায় চীনের সহযোগিতা আদায় করা। ট্রাম্পের দাবি, শি জিনপিং এই বিষয়ে একমত হয়েছেন যে পরমাণু অস্ত্রধারী ইরান বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক এবং চীন এই সংকট সমাধানে আমেরিকাকে সাহায্য করবে। এর পাশাপাশি, তাইওয়ানের চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ওপর ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। তাঁর মতে, অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ভুলের কারণে আমেরিকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্প তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, যা মার্কিন কর্মসংস্থানের ক্ষতি করছে। এই বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কৌশলগত সমীকরণের কারণেই ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য অনুমোদিত মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ আপাতত স্থগিত রেখেছেন।

এশিয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

ট্রাম্পের এই নরম মনোভাবের কারণে তাইওয়ানের নিরাপত্তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চীন যদি তাইওয়ান আক্রমণ করে, তবে মার্কিন সেনাবাহিনী সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না—তা নিয়ে ট্রাম্প কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। এর ফলে ওয়াশিংটनों দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ (Strategic Ambiguity) বজায় থাকলেও, পরোক্ষভাবে তা চীনের হাতকেই শক্তিশালী করল।

এই সিদ্ধান্তের ফলে এশিয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। আমেরিকার এই পিছু হটার কারণে তাইওয়ান আন্তর্জাতিক মহলে একা হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাণিজ্যিক সুবিধা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চীনের সাহায্য পাওয়ার লোভে ট্রাম্প যেভাবে কয়েক দশকের পুরনো মিত্রকে একপ্রকার অভিভাবকহীন করে দিলেন, তা আগামী দিনে বৈশ্বিক কূটনীতিতে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *