ডিজিটাল যুগের নতুন অধ্যায়, মোদীর আবেদনে সাড়া না দিলেও পালাবদল হতেই ‘নেভা’ মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা – এবেলা

ডিজিটাল যুগের নতুন অধ্যায়, মোদীর আবেদনে সাড়া না দিলেও পালাবদল হতেই ‘নেভা’ মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ইতিহাসে এক বড়সড় মোড় পরিবর্তন ঘটল। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এবং অনীহার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কেন্দ্রের ডিজিটাল মঞ্চে শামিল হল রাজ্য। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের এক মাস কাটতে না কাটতেই ‘জাতীয় ই-বিধান অ্যাপ্লিকেশন’ বা ‘নেভা’ ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার জন্য ভারত সরকারের সঙ্গে সমঝোতাপত্র (মউ) স্বাক্ষর করেছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এবং আইন ও বিচার প্রতিমন্ত্রী অর্জুনরাম মেঘওয়ালের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক মউ স্বাক্ষর করেন রাজ্যের নতুন স্পিকার রথীন্দ্র বসু। এই বৈঠকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এর ফলে দেশের ৩৩তম আইনসভা হিসাবে এই ডিজিটাল ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অংশ হলো বাংলা।

স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল পরিষদীয় কাজ

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার কার্যপ্রণালীতে একতরফা সিদ্ধান্ত, বিরোধী দলনেতাকে বারবার সাসপেন্ড করা এবং শাসক দলের অস্বস্তিকর বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার মতো একাধিপত্যের ভুরিভুরি অভিযোগ উঠেছিল। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মউ স্বাক্ষরের ফলে বিধানসভার কার্যকলাপে অভূতপূর্ব স্বচ্ছতা আসবে। এখন থেকে স্পিকার, মন্ত্রী এবং বিধায়কেরা তাঁদের যাবতীয় পরিষদীয় কাজ, যেমন— নোটিস জমা দেওয়া, প্রশ্ন তোলা কিংবা প্রস্তাব আনা, সবকিছুই এই ‘নেভা’ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করবেন। এর ফলে বিধানসভার সমস্ত নথিপত্র এবং কাজের বিবরণী জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, যা আইনসভার পরিচালনায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বাধ্য করবে।

কারণ ও দীর্ঘসূত্রতার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০২১ সালের শেষ দিকে সিমলায় আয়োজিত সর্বভারতীয় অধ্যক্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের সব আইনসভাকে কাগজের ব্যবহার কমাতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘নেভা’ মঞ্চে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কংগ্রেস বা অন্যান্য বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলি এই ডিজিটাল ব্যবস্থায় যোগ দিলেও, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিদায়ী স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা গত পাঁচ বছর ধরে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। যদিও প্রাক্তন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন যে কেন্দ্রের সঙ্গে অসহযোগিতার কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, তবে বাস্তব এটাই যে রাজ্য নিজেকে এই জাতীয় স্বচ্ছতার পরিমণ্ডল থেকে দূরে রেখেছিল। রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরই এই অচলাবস্থা কাটল।

জনসাধারণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

এই নতুন ব্যবস্থার ফলে বিধানসভার কাজকর্মের ওপর সাধারণ মানুষের নজরদারি আরও দৃঢ় হবে। ‘নেভা’ অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা এখন থেকে ঘরের মাঠে বসেই বিধানসভার অধিবেশনের লাইভ সম্প্রচার দেখতে পাবেন, পাশাপাশি নিজেদের মতামত বা পরামর্শ নথিভুক্ত করার সুযোগ পাবেন। সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হওয়ার কারণে আইনসভায় কাগজের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যা পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা নেবে। সর্বোপরি, সমস্ত তথ্য পোর্টালে জনসমক্ষে চলে আসায় বিধানসভার কার্যপ্রণালী নির্দিষ্ট ‘রুলবুক’ বা নিয়ম মেনে চালাতে বাধ্য থাকবে সব পক্ষই। বিচ্ছিন্নতার আবহ কাটিয়ে ডিজিটাল ভারতের মূল স্রোতে বাংলার এই অন্তর্ভুক্তিকে বিধানসভার ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *