তেলের খেলায় শেষ রক্ষা হবে কি? বিশ্ববাজারে চরম অনিশ্চয়তা!

মার্কিন অবরোধে সংকটের মুখে ইরান: দৈনিক ৪০০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির আশঙ্কা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে ইরান বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের সামনে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নতুন ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তেহরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার উপক্রম করেছে। মার্কিন প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের কৌশল ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে, যার ফলে দেশটির দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
দৈনিক ৪০০০ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতি
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর হলে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৪৩৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪,০৮১ কোটি রুপি সমমূল্যের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এই বিপুল ক্ষতির প্রধান কারণগুলো হলো:
- তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়া, যার ফলে প্রতিদিন প্রায় ২৭৬ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।
- দৈনিক গড়ে ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করা দেশটি বর্তমানে লজিস্টিক সংকটে ভুগছে।
- পারস্য উপসাগরের খার্গ দ্বীপকে কেন্দ্র করে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় অর্থনীতির প্রধান উৎসটি সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে।
তেলের মজুত ও বিকল্প পথের সন্ধানে তেহরান
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ইরান বিকল্প হিসেবে জাস্ক টার্মিনাল ব্যবহারের কৌশল গ্রহণ করেছে। হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত এই টার্মিনাল দিয়ে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে তেহরান। তবে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রপথে ইরানের প্রায় ১৫৪ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। এই মজুত দিয়ে দেশটি স্বল্প মেয়াদে প্রভাব কাটানোর চেষ্টা করলেও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়ানো কঠিন হবে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
অবরোধ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও বিশ্ববাজারের ঝুঁকি
ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা মার্কিন প্রশাসনের জন্য বেশ জটিল। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে ১৬টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে, কিন্তু পারস্য উপসাগরে সরাসরি কোনো জাহাজ না থাকায় কৌশলগত সুবিধা নিতে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন। বিশ্বে মোট তেল বাণিজ্যের ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সম্পন্ন হয়। এই অঞ্চলে কোনো ধরনের অবরোধ বা উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি খাদ্য ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ ও কূটনৈতিক লড়াই
ইরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম আল-আলাম আরবির তথ্যানুসারে, গত কয়েক বছরে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই বিশাল ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষে ইরান এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছেও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। ইরান অভিযোগ করেছে, যেসব দেশ তাদের ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, তারা এই পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না।
এক ঝলকে
- দৈনিক ক্ষতি: প্রায় ৪৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৪,০৮১ কোটি রুপি)।
- প্রধান কারণ: মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালীর ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা।
- সংকটপূর্ণ এলাকা: হরমুজ প্রণালী ও খার্গ দ্বীপ বন্দর।
- মোট চাহিদাকৃত ক্ষতিপূরণ: আনুমানিক ২৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
- বৈশ্বিক প্রভাব: জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার তীব্র ঝুঁকি।
