দেড় মাসেই বঙ্গে ক্ষমতাসীন বিজেপির চরম গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, থানা ঘেরাও করে রণক্ষেত্র পরিস্থিতি – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেড় মাসও পার হয়নি, এরই মধ্যে দলের অভ্যন্তরে তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই প্রকাশ্যে চলে এসেছে। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে বিজেপির দলীয় কোন্দল চরম রূপ ধারণ করেছে, যার জেরে শনিবার জামালপুরের ১ নম্বর মণ্ডলের সভাপতিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে থানা ঘেরাও করে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন দলেরই একাংশের নেতা ও কর্মীরা। দলীয় পতাকা হাতে পুরুষ ও মহিলাদের এই বিশাল বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তুমুল উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কড়া পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালে জামালপুরে একাধিকবার রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা গেলেও, রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পরপরই ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এই রূপ নজিরবিহীন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জামালপুর ১ নম্বর মণ্ডলের বিজেপি সভাপতি প্রধানচন্দ্র পালের সঙ্গে ওই একই মণ্ডলের সহ-সভাপতি সুশান্ত মণ্ডলের বিরোধ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি একটি স্থানীয় বালি খাদান থেকে অতিরিক্ত দামে অবৈধভাবে বালি বিক্রি এবং তার লভ্যাংশ বা ‘কাটমানি’ আদায়কে কেন্দ্র করে দুই নেতার অনুগামীদের মধ্যে সংঘাত চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। সুশান্ত মণ্ডলের অনুসারী দুই বিজেপি কর্মীকে মারধর এবং খুনের চেষ্টার অভিযোগ ওঠার পর এই দ্বন্দ্বে ঘৃতাহুতি পড়ে।
কাটমানি ও বালি খাদানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষের নেপথ্য কারণ
আন্দোলনকারী তথা জামালপুরের বিজেপি শক্তিকেন্দ্র প্রমুখ অসীম বিশ্বাস মণ্ডলের সভাপতি প্রধানচন্দ্র পালের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। তাঁর দাবি, অতিরিক্ত দামে বালি বিক্রির প্রতিবাদে তিনি সম্প্রতি একটি বালি খাদান বন্ধ করে দিয়েছিলেন। প্রধানচন্দ্র পাল ওই খাদান থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ পেতেন বিধায় অসীমের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। অভিযোগ, আলোচনার কথা বলে শুক্রবার রাতে অসীমকে ডেকে নিয়ে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয় এবং সুশান্ত মণ্ডলসহ অন্যান্য বিরোধী নেতাদের ফাঁসানোর জন্য জোরপূর্বক একটি মিথ্যা খুনের চেষ্টার মামলার বয়ান লিখিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে সুকৌশলে প্রাণ বাঁচিয়ে তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হন।
অনুরূপভাবে, জামালপুরের বত্রিশ বিঘা গ্রামের ১৩৭ নম্বর বুথের সভাপতি সুধীর মণ্ডলও সভাপতি ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানান, অসুস্থ শরীরে বুকে পেসমেকার নিয়ে এক দরিদ্র গ্রামবাসীর জন্য সরকারি ত্রিপল সংগ্রহ করতে তিনি বিডিও অফিসে গিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত মণ্ডলের সভাপতি প্রধানচন্দ্র পাল ও তাঁর সহযোগী মহেশ নামের এক যুবক বিডিও অফিসের ভেতরেই তাঁকে অতর্কিতে মারধর শুরু করে এবং পরবর্তীতে নিজেদের দলীয় কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে পুনরায় নির্যাতন চালায়। এই ধারাবাহিক নির্যাতন ও জীবননাশের হুমকির প্রতিবাদের জেরেই ক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকেরা থানা ঘেরাও কর্মসূচিতে শামিল হন।
নেতৃত্বের দায় এড়ানোর চেষ্টা ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব
ক্ষমตรฐาน দলের এমন নগ্ন অভ্যন্তরীণ কোন্দল জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে জেলা ও স্থানীয় নেতৃত্বের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের চেয়ে দায় এড়ানোর প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট হয়েছে। বিজেপির কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি স্মৃতিকনা বসু ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানেন না বলে দাবি করেছেন এবং খোঁজ নেওয়ার आश्वासन দিয়েছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত মণ্ডল সভাপতি প্রধানচন্দ্র পাল তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে একে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা বলে দাবি করেছেন।
এই ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন জামালপুরের বিজেপি বিধায়ক অরুণ হালদার। তিনি বিক্ষোভকারীদের দলের সদস্য হিসেবে মানতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং পুরো ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন। বিধায়কের দাবি, প্রকৃত কোনো বিজেপি কর্মী থানায় গিয়ে এমন বিক্ষোভ করতে পারেন না, বরং বিক্ষোভকারীরা আসলে বিজেপির ছদ্মবেশধারী তৃণমূল কংগ্রেসের লোক।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার দেড় মাসের মাথায় বালি খাদানের নিয়ন্ত্রণ, কাটমানি এবং পদাধিকারীদের পারস্পরিক এই সহিংস সংঘাত প্রমাণ করে যে প্রশাসনের ওপর দলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগেই তৃণমূল স্তরে ক্ষমতার দখল নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। বিধায়ক ও স্থানীয় নেতৃত্বের এমন দায়সারা বক্তব্য দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দ্রুত দমন করা না গেলে তা জামালপুরসহ সমগ্র পূর্ব বর্ধমান জেলায় বিজেপির সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
