নাসিক টিসিএস বিপিও-তে যৌন হেনস্থা ও ধর্মীয় বৈষম্য, ৯টি এফআইআরে উঠে এল ভয়াবহ তথ্য!
নাসিকের টিসিএস বিপিও ইউনিটে চরম আতঙ্ক: নারী কর্মীদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও ধর্মীয় বিদ্বেষের অভিযোগ
মহারাষ্ট্রের নাসিকে অবস্থিত টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস (টিসিএস)-এর বিপিও ইউনিটে ঘটে যাওয়া একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা পুরো কর্পোরেট মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। অশোকা মার্গে অবস্থিত এই আইটি প্রতিষ্ঠানের ওডিসি-০২ (ODC-02) ইউনিটে কর্মরত কয়েকজন নারী কর্মীর ওপর দীর্ঘদিনের যৌন নিপীড়ন, শারীরিক নির্যাতন এবং ধর্মীয় বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ৪৮ ঘণ্টায় মুম্বই নাকা পুলিশ স্টেশনে পাঁচজন পুরুষ কর্মীর বিরুদ্ধে ৯টি পৃথক এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে বিষাক্ত পরিবেশ ও পরিকল্পিত অপরাধ
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত শাহরুখ কুরেশি, রাজা মেমন, আসিফ আনসারি, তৌসিফ আত্তর এবং শফি শেখ—এই পাঁচ ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে নারী সহকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করে আসছিলেন। ভুক্তভোগী তিন নারী কর্মীর (দুইজন ২৩ বছর বয়সী এবং একজন ৩৬ বছর বয়সী টিম লিডার) বয়ান অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে পরিবেশ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সেখানে ধর্মীয় পরিচিতি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখা আসাম্ভব হয়ে পড়েছিল। অভিযুক্তরা কেবল যৌন হয়রানিই নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করে পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছিলেন।
অভিযোগের ভয়াবহ চিত্র
পুলিশি নথিতে উঠে আসা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং সুপরিকল্পিত অপরাধের ইঙ্গিত দেয়:
- ধর্মীয় অবমাননা ও ব্ল্যাকমেইল: তৌসিফ আখতার ও দানিশ শেখের বিরুদ্ধে এক তরুণী কর্মীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা এবং ইসলাম কবুল করার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অফিসের প্যান্ট্রিতে ব্ল্যাকমেইল করার পাশাপাশি ভগবান কৃষ্ণ ও শিবলিঙ্গ নিয়ে চরম কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার তথ্যও ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
- ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ: বিবাহিত নারী কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অশালীন প্রশ্ন তোলা এবং গর্ভপাতের মতো ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল বিষয়ে ধর্মীয় তকমা ব্যবহার করে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার অভিযোগ এসেছে।
- শারীরিক হেনস্তা: উৎসবের দিনে শাড়ি পরে আসায় নারী কর্মীদের দিকে অশ্লীল ইঙ্গিত ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আসিফ আনসারির বিরুদ্ধে স্পর্শকাতর অঙ্গে হাত দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
- জোরপূর্বক ধর্মান্তর ও হুমকি: একজন সিনিয়র অ্যানালিস্টকে জোরপূর্বক অহিন্দু খাবার খাওয়ানো এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করার জন্য টুপি পরিয়ে ছবি তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার প্রতিবাদ করায় খুনের হুমকিও দেওয়া হয়েছে ভুক্তভোগীদের।
প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট
এই ঘটনার সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো কর্তৃপক্ষের নীরবতা। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, অপারেশনাল হেড অশ্বিনী চৌনানিকে ঘটনার বিষয়ে বারবার অবহিত করা হলেও কোনো সুরাহা মেলেনি। উল্টো অভিযোগকারী নারীদের মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ সেল (ICC) এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা প্রতিষ্ঠানের পেশাদার সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
আইনি পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিণতি
এই ধরনের ঘটনা কর্পোরেট সংস্কৃতিতে এক গভীর সংকটের সংকেত দিচ্ছে। একইসঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ধর্মীয় উস্কানির এই ঘটনা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। বর্তমানে মামলার তদন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিচ্ছে মুম্বই নাকা পুলিশ। কঠোর ধারায় মামলা রুজু হওয়ার পর থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে। নাসিকের এই ঘটনা বড় বড় আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ নজরদারি ও নৈতিকতা রক্ষার দায়বদ্ধতাকে নতুন করে সমালোচনার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এক ঝলকে
- ঘটনার স্থান: টিসিএস বিপিও ইউনিট (ODC-02), অশোকা মার্গ, নাসিক।
- প্রধান অভিযুক্ত: শাহরুখ কুরেশি, রাজা মেমন, আসিফ আনসারি, তৌসিফ আত্তর ও শফি শেখ।
- মোট অভিযোগ: মুম্বই নাকা পুলিশ স্টেশনে ৯টি পৃথক এফআইআর দায়ের।
- মূল অভিযোগ: যৌন হেনস্থা, ধর্মীয় অবমাননা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরের চেষ্টা এবং ব্ল্যাকমেইল।
- প্রশাসনিক ত্রুটি: অভিযোগ পাওয়ার পরেও দায়িত্বরত অপারেশনাল হেডের কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ।
- বর্তমান অবস্থা: অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান।
