বাংলায় শিল্প ফেরাতে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ‘সোনার বাংলা ফ্রেমওয়ার্ক’ প্যাকেজ

রাজ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং স্তব্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প পরিকাঠামোয় জোয়ার আনতে এবার সরাসরি আসরে নামছে কেন্দ্র সরকার ও নীতি আয়োগ। বাংলায় শিল্পায়নের চাকা পুনরুজ্জীবিত করতে একটি অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও বিশেষ অর্থনৈতিক প্যাকেজ তৈরি করা হচ্ছে, যার পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘সোনার বাংলা ফ্রেমওয়ার্ক’ (Sonar Bangla Framework)। নীতি আয়োগের নবনিযুক্ত ভাইস চেয়ারম্যান তথা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই মেগা প্রকল্পের রূপরেখা ও রোডম্যাপ তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে।
মূলত হাওড়া, হুগলি এবং আসানসোলের মতো রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঞ্চলগুলির ভোলবদল করতেই এই বিশেষ ফ্রেমওয়ার্কের নকশা তৈরি করা হচ্ছে।
পাট, টেক্সটাইল ও MSME-র পুনরুজ্জীবনে বিশেষ রোডম্যাপ
নীতি আয়োগ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই প্যাকেজের মূল লক্ষ্য হলো বাংলার ঝিমিয়ে পড়া ঐতিহ্যবাহী মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলিকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তোলা। এর অধীনে মূলত তিনটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে:
- পাট শিল্প (Jute Industry): হুগলি ও হাওড়া শিল্পাঞ্চলের ধুঁকতে থাকা চটকলগুলির আধুনিকীকরণ, পাট চাষিদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা এবং পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের বিশ্বজনীন বিপণনের জন্য বিশেষ ক্লাস্টার তৈরি করা হবে।
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME): হাওড়ার ঐতিহ্যবাহী ঢালাই শিল্প (Foundry) এবং কুটির শিল্পকে প্রযুক্তির দিক থেকে আপগ্রেড করতে এবং সহজে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে বড়সড় আর্থিক অনুদান মিলবে।
- টেক্সটাইল ও বস্ত্রবয়ন শিল্প: রাজ্যের তাঁত ও বস্ত্রশিল্পের প্রসারে আধুনিক টেক্সটাইল পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে এই প্যাকেজে।
বিহার-ওড়িশার ধাঁচে বিশেষ প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা
কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের এক শীর্ষ কর্তার মতে, পূর্ববর্তী কেন্দ্রীয় বাজেটগুলিতে যেভাবে বিহার বা ওড়িশার মতো পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ও প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, ঠিক সেই ধাঁচেই আগামী কেন্দ্রীয় বাজেটে পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই ‘সোনার বাংলা ফ্রেমওয়ার্ক’-এর অধীনে বিপুল টাকা বরাদ্দ করতে চলেছে মোদী সরকার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলের মতে, বাংলায় ক্ষমতার ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর রাজ্যের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করাকে দিল্লির নতুন প্রশাসন এখন ‘পাখির চোখ’ করেছে।
ডানকুনি শিল্প করিডরকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক সমন্বয়
এই গোটা মহাপরিকল্পনার মূল স্নায়ুকেন্দ্র হতে চলেছে ডানকুনি শিল্প করিডর (Dankuni Industrial Corridor)। এই করিডরটিকে কেন্দ্র করে পূর্ব ভারতের অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বাণিজ্যিক সমন্বয় ও লজিস্টিকস যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় করা হবে। অমৃতসর-কলকাতা শিল্প করিডরের (AKIC) সঙ্গে ডানকুনিকে যুক্ত করে মালপত্র পরিবহণের খরচ এক ধাক্কায় অনেকটাই কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অশোক লাহিড়ীর মতো আন্তর্জাতিক স্তরের প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদের হাত ধরে এই ‘সোনার বাংলা ফ্রেমওয়ার্ক’ যদি আগামী বাজেটে ছাড়পত্র পেয়ে যায়, তবে তা বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে ভরসা জোগাবে এবং গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা বাংলার বন্ধ কারখানার বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়ে এক নতুন শিল্প বিপ্লবের সূচনা করবে।
