বিশ্বের ১০০ উষ্ণতম শহরের মধ্যে ৯৮টিই ভারতে, জলবায়ু পরিবর্তনের চরম মাশুল দিচ্ছে দেশ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
গ্রীষ্মের শুরুতেই নজিরবিহীন ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহে পুড়েছে সমগ্র ভারত। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মে মাস পর্যন্ত চলা এই চরম আবহাওয়ায় পরিস্থিতি এমন এক বিপর্যয়কর পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বিশ্বের ১০০টি সবচেয়ে উষ্ণ শহরের তালিকায় ৯৮টিই ছিল ভারতের। আবহাওয়াবিদদের মতে, এটিকে সাধারণ গরম হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি মূলত বিশ্বজুড়ে দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়ঙ্কর ও স্পষ্ট প্রভাব।
চলতি বছরের এই তাপপ্রবাহে দেশের একাধিক রাজ্যে তাপমাত্রা ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। অনেক এলাকায় পারদ স্বাভাবিকের তুলনায় ৫ থেকে ৮ ডিগ্রি বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। ওড়িশার বলাঙ্গিরে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যাওয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে গরম শহরের তালিকায় কার্যত একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়েছিল ভারতের।
ভয়াবহ তাপপ্রবাহের নেপথ্য কারণ
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার ওপর দীর্ঘ সময় ধরে একটি শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় স্থির হয়ে ছিল। এই ধরনের বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিতে আকাশে মেঘ তৈরি কম হয়, বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রায় থাকে না এবং ভূমির কাছাকাছি গরম বাতাস আটকে যায়। ফলে দিনের পর দিন তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
তবে এই তাৎক্ষণিক কারণের পেছনে রয়েছে আরও বড় বৈশ্বিক বাস্তবতা। নাসার গডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, উনিশ শতকের পর থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। মাত্র ১৫০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর দীর্ঘ জলবায়ু ইতিহাসে এই ধরনের দ্রুত পরিবর্তন অত্যন্ত নজিরবিহীন।
জনস্বাস্থ্য ও পরিকাঠামোয় মারাত্মক প্রভাব
এই চরম গরমের সাথে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা যুক্ত হওয়ায় তা প্রাণঘাতী বিপদে পরিণত হয়েছে। আর্দ্রতা বেশি থাকায় মানুষের শরীর ঘামের মাধ্যমে স্বাভাবিক উপায়ে ঠান্ডা হতে পারেনি। ফলে হিট স্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশনের মতো গুরুতর সমস্যায় ভারত ও পাকিস্তানে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
পাশাপাশি, অতিরিক্ত গরমের জেরে এয়ার কন্ডিশনার ও কুলারের ব্যবহার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বিদ্যুতের চাহিদা নতুন রেকর্ড গড়ে। গত ২১ মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা পৌঁছয় ২৭০.৮ গিগাওয়াটে, যার ফলে একাধিক এলাকায় তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জলসংকট দেখা দেয়। রাজস্থানে গবাদি পশুর মৃত্যুর পাশাপাশি দিল্লির কিছু রাস্তায় পিচের উপরিভাগের তাপমাত্রা ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর খবর মিলেছে।
ভবিষ্যতের বড় শঙ্কা
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আগামী দশকগুলিতে এই ধরনের তীব্র তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন আঘাত হানবে। বর্তমানে পৃথিবীর গড় উষ্ণায়ন ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকায় দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের চরম আবহাওয়া প্রতি পাঁচ বছরে একবার দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমান গতিতে উষ্ণায়ন বাড়তে থাকলে, এই শতাব্দীর শেষে তীব্র তাপপ্রবাহের ব্যবধান কমে প্রতি দুই থেকে তিন বছরে নেমে আসতে পারে।
