বিশ্ব ক্রিকেটে রাজনীতির ছায়া, তোপ দাগল উইজডেন!

বিশ্ব ক্রিকেটে রাজনৈতিক প্রভাব: ‘অরওয়েলীয়’ সংকটের দিকে কি এগোচ্ছে খেলাধুলা?
ক্রিকেট ময়দান কি ক্রমশ রাজনৈতিক ক্ষমতার দাবার বোর্ডে পরিণত হচ্ছে? ঐতিহ্যবাহী ‘উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক’-এর ১৬৩তম সংস্করণে উঠে আসা তথ্য ও বিশ্লেষণ এমন এক আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কথাই তুলে ধরেছে। সম্পাদক লরেন্স বুথ তাঁর সাম্প্রতিক সম্পাদকীয় নোটে দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখন আর রাজনীতির প্রভাবমুক্ত আশ্রয়স্থল নেই; বরং তা ক্রমে ‘অরওয়েলীয়’ হয়ে উঠছে।
‘অরওয়েলীয়’ ক্রিকেটের স্বরূপ
জর্জ অরওয়েলের দর্শন অনুযায়ী, ‘অরওয়েলীয়’ বলতে এমন এক পরিবেশকে বোঝায় যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, নজরদারি এবং তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে মানুষের চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। লরেন্স বুথের মতে, বর্তমান ক্রিকেট প্রশাসনে ঠিক এই ধারাটিই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেখানে বিসিসিআই (BCCI) ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একটি শাখা হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ক্রিকেটের আইন বা নিয়মগুলো এখন ভারতের সুবিধা অনুযায়ী নির্ধারিত হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললে তার দায়ভার চাপানো হচ্ছে অন্যান্য দেশের ওপর।
রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ক্রিকেট
বুথ তাঁর বিশ্লেষণে বেশ কয়েকটি জ্বলন্ত ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যা ক্রিকেটের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে আরও জোরালোভাবে সামনে এনেছে:
- সামরিক সংঘাত ও ক্রিকেটের সংযোগ: এশিয়া কাপে ভারতের জয়ের পর খেলোয়াড়দের সাফল্যকে সেনাবাহিনীর অপারেশন বা ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সঙ্গে তুলনা করে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া জানানোয় সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
- দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন: পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভির ‘রাজনীতি ও খেলাধুলা একসঙ্গে চলতে পারে না’ বিষয়ক মন্তব্যকে বুথ ভারতের ক্রিকেট প্রশাসনের দুর্বল রাজনৈতিক কৌশলের এক প্রতিফলন বলে মনে করেন।
- খেলোয়াড় নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রভাব: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে দূরে রাখার বিষয়টিও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ক্রিকেটীয় ঐতিহ্যের সংকট
উইজডেনের সম্পাদকের মতে, ক্রিকেট যে একসময় বাস্তব রাজনীতির বাইরে একটি সুস্থ বিনোদনের জায়গা ছিল, সেই মর্যাদা আজ অনেকাংশে ক্ষুণ্ণ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রশাসন এখন কেবল খেলার মানোন্নয়ন নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব ক্রিকেটের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারকরা নীরব থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। খেলাধুলার নিরপেক্ষতা বজায় রাখাটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক ঝলকে:
- প্রধান অভিযোগ: বর্তমান ক্রিকেট প্রশাসন ক্রমে ‘অরওয়েলীয়’ বা নিয়ন্ত্রণমূলক হয়ে উঠছে।
- বিসিসিআই-এর ভূমিকা: বিসিসিআই ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির ক্রীড়াঙ্গন শাখা হিসেবে কাজ করছে বলে লরেন্স বুথের দাবি।
- রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: এশিয়া কাপে রাজনৈতিক উত্তাপ এবং খেলোয়াড়দের নিয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক মন্তব্যের উল্লেখ।
- আইপিএলের প্রভাব: মুস্তাফিজুর রহমানের মতো বিদেশি খেলোয়াড়দের নিয়ে সিদ্ধান্ত রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার ইঙ্গিত।
- উপসংহার: খেলাধুলার চেয়ে রাজনীতির প্রভাব অধিক স্পষ্ট হয়ে ওঠায় ক্রিকেটের বিশ্বজনীন আবেদন হারানো ও নিরপেক্ষতার সংকট তৈরি হচ্ছে।
