ভারতীয় সংবিধান তৈরিতে কত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়েছিল? কীভাবে তৈরি হলো বিশ্বের দীর্ঘতম সংবিধান – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
রিপাবলিক ডে স্পেশাল: বিশ্বের বৃহত্তম লিখিত সংবিধান হিসেবে পরিচিত ভারতীয় সংবিধান। কিন্তু আপনি কি জানেন এই বিশাল দলিলটি প্রস্তুত করতে কত টাকা খরচ হয়েছিল কিংবা কতজন মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে এটি পূর্ণতা পেয়েছিল? দেশের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে ভারতীয় সংবিধানের সেই অনন্য ইতিহাস নিয়ে আমাদের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
সংবিধান নির্মাণে ব্যয় ও সময়কাল
ভারতীয় সংবিধান রচনার কাজটি ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই কাজে সংবিধান সভার সময় লেগেছিল প্রায় ৩ বছর। নির্দিষ্ট করে বললে, ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন দীর্ঘ সময় ধরে চলেছিল এই প্রক্রিয়ার কাজ। এই মহতী উদ্যোগে শামিল ছিলেন ৩০০-রও বেশি সদস্য। হাজার হাজার ঘণ্টার বৈঠক ও নিবিড় আলোচনার পর অবশেষে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধানটি গৃহীত হয়।
পুরো এই প্রক্রিয়ায় সেই সময়ে মোট ৬৩ লক্ষ ৯৬ হাজার ৭২৯ টাকা (প্রায় ৬৪ লক্ষ টাকা) খরচ হয়েছিল। বর্তমানের নিরিখে এই অঙ্ক ছোট মনে হলেও তৎকালীন সময়ে এটি ছিল এক বিশাল পরিমাণ। তবে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপনের জন্য এই ব্যয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। এই খরচের মধ্যে সংবিধান সভার পরিচালনা, সদস্যদের ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সংবিধান সভার ঐতিহাসিক যাত্রা
সংবিধান সভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর। আর শেষ বৈঠকটি হয় ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধানটি গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে। প্রতিটি অধিবেশনে সদস্যরা ভারতের আইনি ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন।
- স্থায়ী সভাপতি: ১১ ডিসেম্বর ১৯৪৬ তারিখে ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ সংবিধান সভার স্থায়ী সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।
- অস্থায়ী সভাপতি: ডঃ সচ্চিদানন্দ সিনহা ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬-এর প্রথম বৈঠকে অস্থায়ী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- খসড়া কমিটির সভাপতি: ভারতীয় সংবিধানের প্রধান রূপকার ডঃ বি. আর. আম্বেদকর ছিলেন খসড়া বা ড্রাফটিং কমিটির সভাপতি।
৩০০ সদস্য ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
সংবিধান সভায় ৩০০-রও বেশি সদস্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং রাজ্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সংবিধান রচনার এই অধিবেশনগুলো চলাকালীন প্রায় ৫৩ হাজার মানুষ দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। যা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের সংবিধান তৈরি নিয়ে কতটা উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল।
সংবিধানের খসড়া ও সংশোধন
সংবিধানের প্রাথমিক খসড়াটি সংবিধান উপদেষ্টাদের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল। প্রাথমিক খসড়ায় ৩০৮টি অনুচ্ছেদ এবং ১৩টি তফশিল ছিল। পরবর্তীকালে ড্রাফটিং কমিটি যখন এটি সভার সামনে পেশ করে, তখন তাতে ৩১৫টি অনুচ্ছেদ এবং ৮টি তফশিল ছিল। পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার আগে এতে মোট ৭,৬৩৫টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা
একটি আদর্শ সংবিধান তৈরি করতে একেক দেশের একেক রকম সময় লেগেছে:
- আমেরিকা: মাত্র ৪ মাস (৭টি অনুচ্ছেদ)।
- কানাডা: ২ বছর ৫ মাস।
- অস্ট্রেলিয়া: ৯ বছর।
- দক্ষিণ আফ্রিকা: ১ বছর।সেখানে ভারতের সংবিধান ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিনে তৈরি হয়, যাতে ৩৯৫টি অনুচ্ছেদ এবং ৮টি তফশিল অন্তর্ভুক্ত ছিল (বর্তমানে অনুচ্ছেদ ও তফশিল সংখ্যা আরও বেড়েছে)।
একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো
সংবিধান সভা ভারতকে এক মজবুত গণতান্ত্রিক ভিত্তি দিয়েছে। দীর্ঘ তিন বছরের কঠোর পরিশ্রম এবং সদস্যদের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলেই আজকের এই বিশাল দলিলটি বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এটি আজও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে।
১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান গৃহীত হলেও, ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান সভার শেষ বৈঠকে সকল সদস্য এতে স্বাক্ষর করেন। এরপর ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ভারতের সংবিধান পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়। এই দিন থেকেই দেশজুড়ে ব্রিটিশ আমলের চিহ্ন মুছতে শুরু করে।
ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও অশোক স্তম্ভের নির্বাচন
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি সকাল থেকে ভারতের নিজস্ব নাম, মুদ্রা, সিলমোহর, পতাকা এবং প্রতীক সরকারিভাবে ব্যবহার শুরু হয়। সরকারি দপ্তর এবং আদালত থেকে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ছাপ মুছে ফেলা হয়।
- সেনাবাহিনী থেকে ‘রয়্যাল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয় এবং ইউনিফর্ম থেকে ব্রিটিশ ক্রাউন সরিয়ে দেওয়া হয়।
- নোটের ওপর থাকা রানীর ছবি সরিয়ে দেওয়া হয়।
- সরকারি লেটারহেড থেকে ‘By Order of His Majesty the King…’ কথাটি মুছে যায়।
- জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘জন গণ মন’ এবং জাতীয় গীত হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’ গৃহীত হয়।
ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ‘অশোক স্তম্ভ’ বা চার মাথার সিংহ বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, ডঃ আম্বেদকর এবং সরদার প্যাটেলের দীর্ঘ আলোচনার পর। এটি ছিল ভারত এক সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, যেখানে কোনো ব্যক্তির আদেশ নয় বরং সংবিধানের শাসনই চূড়ান্ত।

