মমতার ‘বিশ্ব বাংলা’ আউট, সরকারি লোগোয় ফিরছে অশোকস্তম্ভ! নীল-সাদার বদলে গেরুয়া থিমে সাজছে নবান্নের ওয়েবসাইট

রাজ্যে ঐতিহাসিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এবার প্রশাসনিক স্তরেও শুরু হলো এক বড়সড় প্রতীকী পালাবদল। বিগত প্রায় ১৩ বছর ধরে নবান্নের অলিন্দ থেকে শুরু করে রাজ্য সরকারের প্রতিটি দফতরে যে ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগোটি প্রশাসনিক পরিচয় হয়ে উঠেছিল, তা এবার পাকাপাকিভাবে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করে দিল নতুন বিজেপি সরকার। সরকারি দফতর, নথিপত্র এবং ওয়েবসাইট থেকে ‘বিশ্ব বাংলা’ লোগো বাদ দিয়ে সেখানে ভারতের জাতীয় প্রতীক ‘অশোকস্তম্ভ’ ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই সল্টলেক যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন (Salt Lake Stadium)-এর গেটে থাকা বিশাল বিশ্ব বাংলা লোগোটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
‘এগিয়ে বাংলা’ পোর্টাল থেকে সরল ‘ব’ লোগো, বদলাল থিম ও মুখ্যমন্ত্রীর ছবি
পরিবর্তনের এই ছোঁয়া সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে রাজ্য সরকারের অফিশিয়াল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে।
- অশোকস্তম্ভের আগমন: রাজ্য সরকারের প্রধান প্রশাসনিক পোর্টাল ‘এগিয়ে বাংলা’ থেকে বিদায় নিয়েছে বাংলা অক্ষর ‘ব’ এবং গ্লোব সম্বলিত বিশ্ব বাংলা লোগো। তার জায়গায় এখন জ্বলজ্বল করছে জাতীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভ।
- নীল-সাদা থেকে গেরুয়া: বিগত তৃণমূল সরকারের জমানায় শহর জুড়ে যে নীল-সাদা থিমের রমরমা ছিল, সরকারি ওয়েবসাইট থেকেও তা সরানো হচ্ছে। নতুন পোর্টালের থিম ও নকশায় এখন গেরুয়া রঙের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে।
- মুখ্যমন্ত্রীর ছবি আপডেট: পোর্টালটিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত ছবি ও রেফারেন্স সরিয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি দিয়ে সম্পূর্ণ আপডেট করা হয়েছে।
‘ব্যক্তিগত লোগো রাজ্যের পরিচয় হতে পারে না’, দাবি বিজেপির
২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব ভাবনা ও তুলির টানে তৈরি হয়েছিল এই ‘বিশ্ব বাংলা’ ব্র্যান্ড। বাংলার হস্তশিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে এটি তৈরি হলেও পরবর্তীতে এটিকেই রাজ্য সরকারের প্রধান লোগো হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়।
এই লোগোটি বদলে ফেলার পেছনে যুক্তি দিয়ে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি— কোনো ব্যক্তির আঁকা বা তৈরি করা লোগো একটি অঙ্গরাজ্যের সরকারি বা সাংবিধানিক পরিচয় হতে পারে না। সরকারি কাজ, নথিপত্র এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভই সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত এবং সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য। সেই কারণেই এই আইনি ও প্রশাসনিক সংশোধন করা হচ্ছে।
মমতা-অভিষেকের রয়্যালটি পাওয়ার দাবি কি সত্যি? রইল আসল তথ্য
সরকার বদলের পর লোগো সরানোর এই প্রক্রিয়া শুরু হতেই সমাজমাধ্যমে এক নতুন বিতর্ক ও গুজব ছড়াতে শুরু করেছে। নেটিজেনদের একাংশ দাবি করছেন, এই লোগোটি ব্যবহার করার জন্য নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য সরকারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের রয়্যালটি বা টাকা পেতেন, আর সেই কারণেই এটি সরানো হচ্ছে।
তবে সরকারি নথিপত্র ও রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, এই রয়্যালটি পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুল। ২০১৭ সালেও তৎকালীন বিজেপি নেতা মুকুল রায় এই লোগোর ব্যক্তিগত মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই সময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আইনিভাবে সেই অভিযোগ খারিজ করেন। পরবর্তীতে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করেছিলেন যে, লোগোটি তিনি নিজেই এঁকেছেন এবং কোনো রকম রয়্যালটি বা আর্থিক সুবিধা না নিয়েই তা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করেছেন। ফলে এর থেকে কারও ব্যক্তিগত লভ্যাংশ পাওয়ার কোনো বিষয় ছিল না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লোগো পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদল নয়। ১৩ বছর ধরে যে ‘বিশ্ব বাংলা’ ব্র্যান্ডটি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয়ের সমার্থক হয়ে উঠেছিল, তাকে মুছে দিয়ে নবান্নে নিজেদের আধিপত্য ও জাতীয়তাবাদী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান শুভেন্দু অধিকারী সরকারের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য।
