মৃত্যুর ওপারেও অটুট আত্মীয়তা, আদিবাসী সমাজের অনন্য পরিবেশ-দর্শন – এবেলা

মৃত্যুর ওপারেও অটুট আত্মীয়তা, আদিবাসী সমাজের অনন্য পরিবেশ-দর্শন – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

আধুনিক রাষ্ট্র যখন জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ‘মায়ের নামে একটি গাছ’ রোপণের মতো নতুন সামাজিক অভিযানের ডাক দিচ্ছে, তখন ইতিহাসের পাতায় ‘অনগ্রসর’ বলে দাগিয়ে দেওয়া জনজাতি সমাজ শতাব্দী প্রাচীন এক জীবন্ত উদাহরণ তৈরি করে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা বা ছত্তীসগড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কুড়মি-সহ বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে আজও এক অনন্য প্রথা টিকে রয়েছে। পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে তাঁর স্মৃতিতে বৃক্ষরোপণ করা হয়। সেখানে প্রয়াত মা হয়ে ওঠেন ‘আম গাছ’ আর বাবা বেঁচে থাকেন ‘শাল’, ‘সেগুন’ কিংবা ‘মহুয়া’র প্রতীকে। গাছকে পরিবারের সদস্য করা এবং এমনকি গাছকে বিয়ে করার মতো রীতিনীতি আদিবাসী সমাজের সংস্কৃতিকে প্রকৃতির সঙ্গে এক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ করেছে।

স্মৃতির আবেগ ও প্রকৃতি রক্ষার নৈতিক দেওয়াল

জনজাতি সমাজের এই প্রথার মূল কারণ নিছক ধর্মীয় আচার নয়, বরং গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত দূরদর্শিতা। আদিপুরুষরা আধুনিক বিজ্ঞানের কার্বন নিঃসরণ বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের পরিভাষা না জানলেও, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গাছের অপরিহার্যতা বুঝতেন। অর্থনৈতিক সম্পদ বা কাঠের বাজারমূল্য হিসেবে নয়, গাছকে তাঁরা বেঁধেছেন আত্মীয়তার সম্পর্কে। এর ফলে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দেওয়াল তৈরি হয়; পরবর্তী প্রজন্ম মায়ের স্মারক হিসেবে বেঁচে থাকা আম গাছ বা বাবার প্রতীকের শাল গাছটিকে কাটতে বুক কাঁপে। আধুনিক রাষ্ট্র যেখানে আইন ও শাস্তির মাধ্যমে বন রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে আদিবাসী সমাজ আবেগ ও সংস্কৃতির মাধ্যমে অরণ্য সংরক্ষণের এক টেকসই মডেল তৈরি করেছে।

উন্নয়নের আগ্রাসন ও শিকড় রক্ষার সংগ্রাম

বর্তমান যুগে যখন উন্নয়ন আর বনভূমি ধ্বংস সমার্থক হয়ে উঠেছে, তখন এই জীবনদর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। একদিকে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের টুর্গা প্রকল্প বা বীরভূমের দেউচা পাঁচামির কয়লাখনি প্রকল্পের মতো উদ্যোগের কারণে বিপুল বৃক্ষনিধন ও আদিবাসী ক্ষোভের নজির মিলছে, অন্যদিকে ২০০৬ সালের ‘অরণ্য অধিকার আইন’ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অভাব স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত নগরায়ন ও যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার যুগে আদিবাসীদের এই বৃক্ষ-সংস্কৃতি মানুষকে শিকড়হীন হওয়া থেকে বাঁচায়।

বিশ্বের পরিবেশবিদরা আজ যে ‘সাস্টেইনেবল লিভিং’ বা ‘ইকোলজিক্যাল হারমনি’র তত্ত্ব প্রচার করছেন, জনজাতিরা তা অনাদিকাল ধরে চর্চা করে আসছে। সরকারি স্তরের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি তখনই সফল হবে, যখন তা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে আদিবাসী সমাজের মতো প্রকৃতির সাথে আত্মিক ও পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *