মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিমান বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন পাইলট, আহমেদাবাদ দুর্ঘটনার মর্গে মিলল অকাট্য প্রমাণ – এবেলা

মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিমান বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন পাইলট, আহমেদাবাদ দুর্ঘটনার মর্গে মিলল অকাট্য প্রমাণ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

গত বছরের জুন মাসে আহমেদাবাদে ঘটে যাওয়া এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমান দুর্ঘটনাটি দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৬০ জন যাত্রী। ঘটনার দীর্ঘ সময় পর এবার সেই অভিশপ্ত বিমানের মর্মান্তিক এক সত্য সামনে এল। মর্গে মৃতদেহ শনাক্ত করতে যাওয়া এক প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণী থেকে জানা গেছে, মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিমানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে যাত্রীদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন প্রধান পাইলট সুমিত সাভারওয়াল। মৃত্যুর পরও তাঁর নিথর হাত দুটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল বিমানের চালক-দণ্ড বা ‘ইয়োক’।

মর্গের বিভীষিকা ও প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি

দুর্ঘটনায় নিজের পরিবারের তিন সদস্যকে হারানো রোমিন ভোহরা নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী সম্প্রতি সেই সময়ের মর্গের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। দেহ শনাক্তকরণের জন্য মর্গে প্রবেশ করে তিনি যে দৃশ্য দেখেন, তা এক চরম নরককুণ্ডের সমতুল্য। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ছিন্নভিন্ন ও দগ্ধ মরদেহের মাঝে তাঁর নজর কাড়ে বিমানের ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়ালের দেহটি। রোমিনের দাবি অনুযায়ী, পাইলটের দেহটি একটি কোণে বসার ভঙ্গিতে রাখা ছিল। তাঁর পিঠের অংশ পুড়ে গেলেও শরীরের সামনের অংশ, কাঁধে চারটি সোনালি ডোরাযুক্ত সাদা ইউনিফর্ম, কালো টাই এবং জুতো সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, তাঁর দুই হাতে তখনও শক্ত করে ধরা ছিল বিমান নিয়ন্ত্রণের দুই হাতলযুক্ত স্টিয়ারিং বা ইয়োক, যা সংঘর্ষের তীব্রতায় বা উদ্ধারকাজের সময় মূল অংশ থেকে ভেঙে এসেছিল। সংশ্লিষ্ট মর্গের একজন চিকিৎসকও এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

তদন্তের মোড় ও দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুর পরও স্টিয়ারিং আঁকড়ে থাকার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ক্যাপ্টেন সাভারওয়াল শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত বিমানটিকে দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। অথচ, দুর্ঘটনার পর এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর (AAIB) প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে পুরো দায় চাপানো হয়েছিল পাইলটের ওপর। নতুন এই তথ্য সেই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

পাশাপাশি, মার্কিন সংস্থা ‘এভিয়েশন সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান এড পিয়ারশনের একটি বিস্ফোরক দাবি এই দুর্ঘটনার নেপথ্যে যান্ত্রিক ত্রুটির দিকেই আঙুল তুলছে। তাঁর মতে, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানটিতে আগে থেকেই মারাত্মক কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে বিমানটিতে শর্ট সার্কিট, ধোঁয়া নির্গমন এবং বৈদ্যুতিক তারের গোলযোগের ইতিহাস রয়েছে, যার কারণে এটিকে বেশ কয়েকবার উড়ান বন্ধ করে মেরামতের জন্য গ্রাউন্ডেডও করা হয়েছিল। এমনকি বিমানের ইঞ্জিনে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পি-১০০ পাওয়ার প্যানেল’ প্রতিস্থাপন করা সত্ত্বেও বিমানটির ডিজাইন ও সফটওয়্যারগত নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

সম্ভাব্য প্রভাব

এই নতুন তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়ায় এক বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে চলেছে। প্রথমত, পাইলটের ওপর দায় চাপানোর যে চেষ্টা প্রাথমিক রিপোর্টে করা হয়েছিল, তা তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এবং পাইলটের পেশাদারিত্ব ও বীরত্ব নতুন করে মূল্যায়িত হবে। দ্বিতীয়ত, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের মতো আন্তর্জাতিক মানের বিমানের উৎপাদন ত্রুটি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতি নিয়ে বৈশ্বিক বিমান চলাচল ক্ষেত্রে নতুন করে কঠোর জবাবদিহিতার সৃষ্টি হতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *